কারাবালার ঘটনার ইতিহাস নিয়ে ভুল ধারণা মানুষের মাঝে Karabalar Sotik Itihas Bangla হুসাইনের মৃত্যু নিয়ে ভুল

 

কারাবালার ঘটনার ইতিহাস নিয়ে ভুল ধারণা মানুষের মাঝে Karabalar Sotik Itihas Bangla হুসাইনের মৃত্যু নিয়ে ভুল

হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এর মাথা কোথায় গিয়েছিল?

দামেস্কে ইয়াযীদের দরবারে হুসাইনের মাথা প্রেরণের বর্ণনা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয় নি। বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, তিনি কারবালার প্রান্তরে শহীদ হয়েছেন। তাঁর সম্মানিত মাথা কুফার গভর্নর উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে আল-আশতার নাখ’য়ীর হাতে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ নির্মমভাবে নিহত হন। যখন নিহত হলেন তখন তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মসজিদে রাখা হল। তখন দেখা গেল একটি সাপ এসে মাথার চারপাশে ঘুরছে। পরিশেষে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের নাকের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে মুখ দিয়ে বের হল। ফের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে নাকের ছিদ্র দিয়ে তিনবার বের হতে দেখা গেল। (দেখুন: তিরমিযী, ইয়াকুব ইবন সুফীয়ান)
ফুরাত নদীর পানি পান করা থেকে বিরত রাখার কিচ্ছা
বেশ কিছু গ্রন্থ তাকে ফুরাত নদীর পানি পান করা থেকে বিরত রাখার ঘটনা বর্ণনা করে থাকে। আর বলা হয় যে, তিনি পানির পিপাসায় মারা যান। এ ছাড়াও আরও অনেক কথা বলে মানুষকে, আবেগময় করে যুগে যুগে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে এবং মূল সত্যটি উপলব্ধি করতে তাদেরকে বিরত রাখার হীন ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এ সব কাল্পনিক গল্পের কোনাে ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। ঘটনার যতটুকু সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে আমাদের জন্য ততটুকুই যথেষ্ট। কোনাে সন্দেহ নেই যে, কারবালার প্রান্তরে হুসাইন নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ধ্বংস হােক হুসাইনের হত্যাকারীগণ! ধ্বংস হােক হুসাইনের হত্যায় সহযােগীরা! আল্লাহর ক্রোধ তাদেরকে ঘেরাও করুক। আল্লাহ্ তা’আলা রাসূলের দৌহিত্র শহীদ হুসাইন এবং তাঁর সাথীদেরকে আল্লাহ তা’আলা স্বীয় রহমত ও সন্তুষ্টি দ্বারা আচ্ছাদিত করুক।
কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত ধারণা ঠিক নয়
হুসাইন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুতে আকাশ থেকে রক্তের বৃষ্টি হওয়া, সেখানের কোনাে পাথর উঠালেই তার নীচ থেকে রক্ত প্রবাহিত হওয়া এবং কোনাে উট জবাই করলেই তা রক্তে পরিণত
হয়ে যাওয়ার ধারণা মিথ্যা ও বানােয়াট। মুসলিমদের আবেগ ও অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলে তাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এ সমস্ত বানােয়াট ঘটনা বলা হয়ে থাকে। এগুলাের কোনাে সহীহ সনদ নেই।
ইয়াযীদ সম্পর্কে একজন মুসলিমের ধারণা কেমন হওয়া উচিত 
তাফসীর, হাদীছ, আকীদা, এবং ইতিহাস ও জীবনীর কিতাবগুলাে অধ্যয়ন করে যতদূর জানতে পেরেছি, তাতে দেখা যায় সালাফে সালেহীনের নিকট গ্রহণযােগ্য এবং অনুকরণীয় কোনাে ইমামের কিতাবে ইয়াযীদের উপর লা’নত করা বৈধ হওয়ার কথা আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় নি। কেউ তার নামের শেষে রাহিমাহুল্লাহ বা লা’আনা হুল্লাহ- এ দু’টি বাক্যের কোনােটিই উল্লেখ করেন নি। সুতরাং তিনি যেহেতু তার আমল নিয়ে চলে গেছেন, তাই তার ব্যাপারে আমাদের জবান দরাজ করা ঠিক নয়। তাকে গালাগালি করাতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছু অর্জিত হবে না। তার আমল নিয়ে তিনি চলে গেছেন। আমাদের আমলের হিসাব আমাদেরকেই দিতে হবে। তার ভাল মন্দ আমলের হিসাব তিনিই দিবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আমার উম্মতের একটি দল কুস্তুনতীনিয়ায় (কনস্টান্টিনােপল) যুদ্ধ করবে তাদেরকে ক্ষমা করা দেওয়া হবে। জানা যাচ্ছে, ইয়াযীদ ইবন মু’আওয়িয়া ছিলেন সেই যুদ্ধের সেনাপতি। আর হুসাইন তাতে সাধারণ সৈনিক হিসেবে শরীক ছিলেন। সুতরাং ইয়াযীদও ক্ষমায় শামিল হতে পারে। আল্লাহই ভাল জানেন।

হুসাইনের মৃত্যু নিয়ে লােকেরা তিনভাগে বিভক্ত

একদলের মতে, তিনি অন্যায়ভাবে মুসলিমদের ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য ইয়াযীদের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তাই তাঁকে হত্যা করা সঠিক ছিল। তারা বুখারী শরীফের এই হাদীছ দিয়ে
দলীল দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “ একজন শাসকের সাথে তােমরা ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় যদি তােমাদের জামা’আতে বিভক্তি সৃষ্টির জন্য কেউ আগমন করে তবে তাকে হত্যা করাে।” (বুখারী) তারা বলেন: মুসলিমরা ইয়াযীদের শাসনের উপর ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। হুসাইন এসে সেই ঐক্যে ফাটল ধরানাের চেষ্টা করেছেন। সুতরাং তাঁকে হত্যা করা যুক্তিসংগত হয়েছে।

অন্যদল মনে করেন হুসাইনই ছিলেন খেলাফতের একমাত্র হকদার। তাঁর আনুগত্য করা ব্যতীত অন্য কারও অনুসরণ করা বৈধ ছিল না। জামা’আত, জুমআসহ ইসলামের কোনাে কাজই তাঁর পিছনে বা তাঁর নিয়ােগ কৃত প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কারও অনুসরণ করে সম্পাদন করলে তা বাতিল হবে। এমন কি তাঁর অনুমতি ব্যতীত শত্রুদের
 বিরুদ্ধে জিহাদ করাও বৈধ ছিল না। এমনি আরও অনেক কথা। এই দলের কথার সমর্থনে কোনাে সুস্পষ্ট দলীল খুঁজে পাওয়া যায় নি।

উপরােক্ত উভয় দলের মাঝখানে হচ্ছে আহলে সুন্নত ওয়াল জামআতের মাজহাব। তাঁরা উপরের দুটি মতের কোনটিকেই সমর্থন করেন না। বরং তাঁরা বলেন: হুসাইন মজলুম ও শহীদ অবস্থায়

নিহত হয়েছেন। তিনি মুসলিম জাতির নির্বাচিত আমীর বা খলীফা ছিলেন না। সুতরাং দ্বিতীয় মতের পােষণকারীদের কথা ঠিক নয়। আর যারা বুখারী শরীফের হাদিছকে দলীল হিসেবে পেশ করে
হুসাইনকে হত্যা করা বৈধ হওয়ার কথা বলে থাকেন তাদের দলীল গ্রহণ সঠিক নয়। হাদীছ কোনােভাবেই তাদের কথাকে সমর্থন করে । কারণ তিনি যখন তাঁর চাচাতাে ভাই মুসলিম ইবন আকীলের। চিঠি পেলেন তখন খেলাফতের দাবী ছেড়ে দিয়ে ইয়াযীদের সৈনিকদের কাছে তিনটি প্রস্তাব পেশ করেছেন;
• সিরিয়ায় গিয়ে তাঁকে ইয়াযীদের সাথে সাক্ষাত করতে দেওয়া হােক।
• অথবা তাকে মুসলিম রাজ্যের কোনাে সীমান্তের দিকে যেতে দেওয়া হােক।
• অথবা তাঁকে মদিনায় ফেরত যেতে দেওয়া হােক।
কিন্তু তারা কোনাে প্রস্তাবই মেনে নেয় নি। বরং তারা তাঁকে আত্মসমর্পণ করে তাদের হাতে বন্দী হওয়ার প্রস্তাব করল। অস্ত্র ফেলে দিয়ে তাদের পাল্টা প্রস্তাব মেনে নেওয়া হুসাইনের উপর
মােটেই ওয়াজিব ছিল না। সুতরাং তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করাকেই বেছে নিলেন এবং ইয়াযীদের বিরাট বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করে শাহাদাত বরণ করলেন।
পরিশেষে বলতে চাই যে, হুসাইনের মৃত্যু ও কারবালার ঘটনা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা কোনাে মুসলিমের কাজ হতে পারে না। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অন্যান্য মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড থেকে আলাদা কোনাে ঘটনা নয়। এ জাতীয় সকল ঘটনাকে সমানভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। বিষাদসিন্ধু মুসলিমদের কোনাে মূলনীতির গ্রন্থ নয়। এটি একটি কাল্পনিক উপন্যাস মাত্র। তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলিম জাতি ঐতিহাসিকভাবে একটি প্রমাণিত সত্যকে বাদ দিয়ে কাল্পনিক কাহিনীকে কখনই সত্য হিসাবে গ্রহণ
পারে ।

Leave a Comment