জান্নাতের খাবার পোশাক যানবাহন পরিবেশ । আল্লাহর উপহার জন্নাতীদের । Jannat Kemon Hobe

জান্নাতের খাবার পোশাক যানবাহন পরিবেশ । আল্লাহর উপহার জন্নাতীদের । Jannat Kemon Hobe

জান্নাতীদের খাবার 
বেহেশতের পাখ-পাখালী বেহেশতীদের খাবার হিসেবে পাখীর গােশতও দেয়া হবে। যেমন সূরা ওয়াকিয়ায় আল্লাহ তাআলা বলেন, “তাদের বাসনা অনুযায়ী পাখীর গােশতও থাকবে।”


হযরত আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, বেহেশতে উটের ন্যায় বিরাট বিরাট লম্বা গর্দান বিশিষ্ট পাখী থাকবে, যারা বেহেশতের বৃক্ষের শাখায় শাখায় বিচরণ করবে। হযরত আবু বকর (রা) আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! পাখীগুলাে তাে খুব আনন্দঘন জীবন যাপন করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, তাদের তুলনায় যারা তাদের গােশত আহার করবে, তারা থাকবে অধিকতর সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে। নবী করীম (সঃ) একথা তিনবার বললেন। অতঃপর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা)-কে এ মর্মে সুসংবাদ দেয়া হল যে, আমি আশা করি, তুমিও তাদের মধ্যে থাকবে, যারা এ পাখীগুলাে আহার করবে।—আহমদ, আত্তারগীব অত্তারহীব । 


হযরত আবু উমামাহ (রা) বলেন, বেহেশতীদের কারাে পাখীর গােশত আহার করার বাসনা জাগলে, পাখীরা নিজে নিজেই তাদের সম্মুখে এসে উপস্থিত হবে।


“নিঃসন্দেহে মুত্তাকীগণ বেহেশতের বাগ-বাগিচা ও অফুরন্ত নেয়ামতের পরিবেশে বসবাস করবে। তাদের প্রতিপালক তাদেরকে যা কিছু দান করবেন, তাতে তারা খুশি হবে। আর তাদের প্রতিপালক তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করবেন। তাদেরকে বলা হবে, পার্থিব জীবনে তােমরা যে নেক আমল করতে, তার প্রতিদান স্বরূপ পরিতৃপ্তি সহকারে পানাহার কর (সূরা তুর) | বেহেশতীগণ অবশ্যই বেহেশতে পানাহার করবে। কিন্তু তারা থুথু ফেলবে না এবং পেশাব পায়খানা করবে না। আর নাসিকা পরিষ্কার করারও প্রয়ােজন হবে না। হযরতগণ জিজ্ঞেস করলেন, পানাহার করলে যদি পায়খানা পেশাব না হয় তবে বর্জ্য কিভাবে নির্গত হবে। নবী করীম (সঃ) বললেন, বেহেশতীদের ঢেকুর আসবে এবং মেশকের সুগন্ধের ন্যায় ঘাম হবে, ফলে পেট খালি হয়ে যাবে (পায়খানা-পেশাবের প্রয়ােজন হবে না) । তাদের মুখে সর্বদা আল্লাহ তাআলার তাসবীহ-তাহলীল এমনভাবে জারি থাকবে, যেমন তােমাদের বিনা ইচ্ছায় শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকে (মুসলিম, মেশকাত) ।



বেহেশতীদের আহার্য পাত্র 

এ প্রসঙ্গে সূরা যুখরফে আল্লাহ তাআলা বলেন- “তাদের সমক্ষে স্বর্ণের পেয়ালা ও গ্লাস নিয়ে যাওয়া হবে। যার মধ্যে পানাহারের দ্রব্য থাকবে। সেখানে তারা সেসব বস্তু লাভ করবে, যা তাদের মনে চায় এবং যা দ্বারা তাদের নয়ন জুড়িয়ে যায়। আর তাদের বলা হবে- তােমরা এখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে (সূরা যুখরাফ) ।অর্থাৎ ঐ সব গ্লাসে এ পরিমাণে পানীয় ভরে তাদের কাছে পেশ করা হবে, যা হবে সে সময়কার তাদের মনের চাহিদা অনুযায়ী। তার চেয়ে কিছু কম বেশি হবে না। এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, বেহেশতীদের আহার্য পাত্র হবে সােনা ও রূপার ।


বেহেশতীদের যানবাহন 
হযরত বুরায়দাহ (রা) বলেন, জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! বেহেশতে কি ঘােড়া থাকবে? প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, আল্লাহ তাআলা যদি তােমাকে বেহেশতে প্রবেশ করান এবং তুমি যদি কালাে ইয়াকুত রংয়ের ঘােড়ায় চড়তে চাও, তাহলে তােমাকে তাও দান করা হবে। আর সে ঘােড়া তােমাকে নিয়ে বেহেশতে উড়ে বেড়াবে। তুমি যেখানেই যেতে চাইবে, সেখানেই নিয়ে যাবে।

অতঃপর আর এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহু! বেহেশতে কি উট থাকবে? নবী করীম (সঃ) তাকেও অনুরূপ জওয়াবই দিলেন, যা প্রথম ব্যক্তিকে দিয়েছিলেন। তিনি তাকে আরও বললেন, আল্লাহ তাআলা তােমাকে বেহেশতে প্রবেশ করালে তােমার মনে যা চাইবে তাই তােমাকে দান করা হবে। যা দেখে তােমার নয়ন জুড়িয়ে যাবে। –তিরমিযী, মেশকাত। 


বেহেশতীদের পারস্পরিক ভালবাসা 
কোরআন মজীদের সূরা হুজরাতে আল্লাহ তাআলা বলেন : “আমি বেহেশতীদের অন্তর হতে (পার্থিব জীবনের) হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেবে। তখন তারা ভাই ভাই হয়ে থাকবে এবং সুসজ্জিত আসনে সামনা-সামনি আসন গ্রহণ করবে। –সূরা হিজর- ৪র্থ রুকু। 


কোন কারণবশত দুনিয়ার জীবনে যদি কারাে প্রতি কারাের ঘৃণা বিদ্বেষ থেকে থাকে, তাহলে বেহেশতে প্রবেশের পূর্বেই আমি তা তার অন্তর থেকে পৃথক করে ফেলব। ফলে সমস্ত বেহেশতীরা সেখানে পরস্পর ভাই ভাইয়ের মত বসবাস করবে। কারাে মনে তখন আর কোন ঘৃণা-বিদ্বেষ ও দোষ থাকবে না।


তাফসীরে ইবনে কাছীর- ২য় খণ্ড। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মুমিন বান্দারা যখন পুলসেরাত পার হয়ে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ লাভ করবেন, তখন বেহেশতে প্রবেশ করার পূর্বেই যখন পারস্পরিক জুলুম-অত্যাচার ও অন্যায়-অবিচারের ফয়সালা হয়ে যাবে এবং মনের ঘৃণা-বিদ্বেষ দূর করা হবে, তখন আর ঘৃণা ও শত্রুতা পােষণের কোন কারণ থাকবে না। আর একজন ক্ষুদ্র ও সাধারণ বেহেশতীও যখন মনে করবে যে, আমি যা লাভ করেছি, তা আর কেউ লাভ করেনি। তখন বিনা কারণে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হওয়ার কোন কারণই থাকবে না —মুসলিম।


বেহেশতীদের আমােদ-প্রমােদ 
বেহেশতীগণ পরস্পর পানীয় ছিটিয়ে আমােদ ফুর্তি করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআ’লা বলেন “সেখানে তারা শরাবের পেয়ালা নিয়ে পরস্পরে টানাটানি ও ছিটাছিটি করবে। আর সে শরাব পানে তাদের কোন নেশা হবে না। তাই তারা প্রলাপও বকবে না। আর নির্বোধের ন্যায় কোন অসংলগণ কথাও বলবেনা। -সূরা তুর

 

বেহেশতীদের পােশাক ও অলংকার 
বেহেশতীদের পােশাক হবে সবুজ রংয়ের রেশমের এবং তাদের অলংকার হবে স্বর্ণ ও মনিমুক্তা দ্বারা তৈরি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন ঃ “যারা ঈমান এনেছে ও নেক আমল করে, আমি তাদের প্রতিদান কখনাে বিনষ্ট করব যারা উত্তম পথে চলে, তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী বেহেশত। যার তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। সেখানে তাদেরকে সােনার কাকন। পরিধান করান হবে। তারা সবুজ রংয়ের পােশাক পরিধান করবে, যা হবে শুকনাে ও পুরু রেশম দ্বারা তৈরি। আর সেখানে তারা সুসজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসবে। কত সুন্দর প্রতিদান এবং কত সুন্দর আরামের স্থান বেহেশত।”-সূরা কাহাফ 


বেহেশতীদের পােশাকের কথা বলা হয়েছে যে, তারা মিহিন ও পুরু রেশমের তৈরি সবুজ রংয়ের পােশাক পরিধান করবে । বেহেশতীদের জন্য সবুজ রং এজন্য নির্বাচন করা হয়েছে যে, সমস্ত রংয়ের মধ্যে এ
 রংটিই হচ্ছে সর্বোত্তম।আর অন্যান্য রংয়ের তুলনায়
 এটি সর্বাপেক্ষা সজীবতার ধারক ও বাহক।


“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সেসব লােকদেরকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন, যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে। সে বেহেশতের তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে । তাদেরকে সেথায় স্বর্ণের কাংকন ও মােতি পরিধান করান হবে, আর যার ইচ্ছে হয় সে পুরু কাপড় পরিধান  করবে ।”


এখানে একটি প্রশ্ন দেখা দেয় যে, কাকন তাে মহিলাদের হাতে শােভা পায়, পুরুষগণ তা পরিধান করলে কেমন লাগবে?


এর উত্তর হচ্ছে, কোন পােশাক বা অলংকারাদি শােভাময় রুচিশীল হওয়াটা প্রত্যেক দেশ ও অঞ্চলের সাধারণ মানুষের চাহিদা ও প্রথার উপর নির্ভরশীল। দুনিয়ায় যদিও পুরুষগণ কংকন পরিধান করে না, কিন্তু বেহেশতে তারা আগ্রহ সহকারে তা পরিধান করবে। আর সকলের কাছে দেখতে তা ভাল লাগবে। মনে করুন ঘড়ির চেইন। এটা নানা প্রকারে হয় এবং সবাই নিজ নিজ রুচি মাফিক তা ব্যবহার করে। মানুষ বিভিন্ন প্রকার অলংকার পরিধান করে। আর সে অলংকার পুরুষের হাতে ভালই মানায়। কোন কোন সম্পদ্রায় বিবাহ অনুষ্ঠানে দুলাকে কংকন পরিধান করায় এবং সমবয়সী সকল লােকে তা অবলােকন করে খুশী হয়। যেহেতু সেখানকার প্রথা হচ্ছে এই, তাই সকলের দৃষ্টিতেই তা হবে দৃষ্টি নন্দন। তারা এ প্রথা পালনে এতটা দৃঢ় হয় যে, শরীয়তের বাধা নিষেধও তারা মানে না। 


আর একটি প্রশ্ন দেখা দেয় যে, হাতের পাঞ্জা হতে কনুই পর্যন্ত অলংকার আচ্ছাদিত হওয়া তাে ভাল মানায় না এবং দেখতেও দৃষ্টিকটু মনে হয়। তবে তা কেন?


এর উত্তর হচ্ছে, এটাও দুনিয়ার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী খারাপ মনে হয়, কিন্তু বেহেশতে সকলের কাছেই তা পছন্দনীয় মনে হবে এবং আগ্রহ সহকারে পরিধান করবে। কোন কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে এ প্রচলনও আছে যে, তাদের মহিলারা কনুই পর্যন্ত অলংকার পরিধান করে। আর সেটা সকলের কাছেই পছন্দনীয় ও শােভাময় মনে হয়।



বেহেশতীদের মাথার তাজ 

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, বেহেশতীদের মাথায় তাজ পরান হবে। সে তাজের ক্ষুদ্রতম মােতিটির উজ্জ্বলতা এত হবে যে, তার উজ্জ্বলতায় পূর্ব পশ্চিমের মধ্যবর্তী স্থান আলােকিত করে ফেলবে -তিরমিযী, মেশকাত। 

বেহেশতীদের বিছানা 
সূরা আর রহমানে আল্লাহ তাআলা বলেন- “তারা এমন শয্যায় হেলান দিয়ে বসবে, যার খােল বা আস্তর পুরু রেশম দ্বারা তৈরি। আর উভয় বেহেশতের ফলফলারি তাদের নিকটবর্তী হবে। অতএব তােমরা তােমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ নেয়ামতকে অস্বীকার করবে” -সূরা আর-রাহমান ।


আরবী ভাষায় মােটা রেশমকে ইস্তেবরাক বলা হয়। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুললাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, এখানে তাে তােমাদেরকে শয্যার নীচের কাপড় সম্পর্কে বলা হয়েছে। আর সেটা হবে ইস্তেবরাক বা মােটা রেশম দ্বারা তৈরি। সুতরাং এর দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, গায় দেয়ার বা উপরের কাপড়টি কত সুন্দর ও উন্নতমানের হবে ।


এ সূরারই শেষ দিকে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন- “তারা সবুজ রংয়ের চাদরের উপর উপবিষ্ট থাকবে। আর আশ্চর্য রকমের সুন্দর বিছানায় হেলান দেয়া অবস্থায় থাকবে। অতএব তােমরা তােমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ নেয়ামতকে অস্বীকার করবে? তােমার প্রতিপালকের নাম তাে বরকতময়, যিনি প্রতিপত্তি ও উচ্চ সম্মানের অধিকারী।” –সূরা আর-রাহমান- শেষ রুকু।


প্রথম আয়াতে উচু শ্রেণীর বেহেশতীদের বিছানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা বলা হয়েছে যে, শয্যার আস্তরণ অর্থাৎ নীচের কাপড়টি হবে পুরু রেশমের। কিন্তু শয্যার উপরের আবরণ বা গারচাদরের কথা আলােচনা করা হয়নি। কারণ, আস্তরের উপর কিয়াস করেই উপরের চাদরের কথা বুঝা যাবে । কিন্তু এ আয়াতে তুলনামূক নিম্ন স্তরের বেহেশতীদের শয্যার কথা আলােচনা করা হয়েছে, যাতে শয্যার আস্তরের কথা উল্লেখ নেই। শুধু উপরের চাদরের কথা বলা হয়েছে।—ইবনে কাছীর


সূরা গাশিয়ায় আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “সেখানে রয়েছে উন্নততর শয্যা। আর প্রস্তুত থাকবে পানপাত্র, সারি সারি বালিশ এবং বিছানা ও গালিচা।”

আসনগুলাে সােনার তার দ্বারা সুসজ্জিত করে নির্মাণ করা হবে । (দুনিয়ায় যেমন বাশ ও বেত দ্বারা চেয়ার ও বিভিন্ন আসন সুক্ষ্মভাবে বুনানাে হয়ে থাকে।) মােফাসসীর আল্লামা সুদ্দি (র) বলেন, সে আসনগুলাে হবে স্বর্ণ ও মােতি খচিত -ইবনে কাছীর। 


মােটকথা, বেহেশতে যেসব আসন থাকবে, তা হবে অদ্ভুত বিস্ময়কর শােভাময় ও পছন্দনীয় আসন। তার রূপমাধুরী সৌন্দর্য ও মনােরম অবস্থা এ দুনিয়ায় বসে অনুমান করা সম্ভব নয়।


 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *