জান্নাতের বাগান খাবার পথ বিবরণ ও আল্লাহর নেয়ামত । হাশরের ময়দান

জান্নাতের নেয়ামত বা বেহেশতের সুখ-শান্তি

বেহেশতের নির্মাণ সামগ্রী হযরত আবু হােরায়রা (রা) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল ! বেহেশত কি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ? প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, বেহেশত নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্বর্ণের ইট এবং একটি রৌপ্যের ইট এবং তার গাঁথুনীর মশল্লা হচ্ছে সুগন্ধী মেশক, আর কঙ্কর হচ্ছে মনিমুক্তা ও ইয়াকুত পাথর। আর তার মাটি হচ্ছে জাফরান। যে ব্যক্তি বেহেশতে প্রবেশ করবে, সে সর্বদাই অফুরন্ত নেয়ামতের মধ্যে জীবন যাপন করবে। সে কখনাে কোন কিছুর অভাব বােধ করবে না, চিরকাল সেথায় অবস্থান করবে। কখনাে তার মৃত্যু ঘটবে না। বেহেশতীদের কাপড় কখনাে পুরন হবে না এবং তাদের যৌবনও কখনাে বিনষ্ট হবে না –তিরমিযী, আহমদ, মেশকাত ।

বেহেশতের প্রশস্ততা কোরআন মজীদে আল্লাহ তাআ’লা বেহেশতের প্রশস্ততা বর্ণনায় বলেন ও “তােমরা তােমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং এমন বেহেশতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও, যে বেহেশতের প্রশস্ততা হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততার সমান । তাদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে, যারা আল্লাহ ও তার শেষ রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।”-সূরা হাদীদ- ৩য় রুকু। 

ডান হাতে আমলনামা পেয়েছে, সে কতই না উত্তম। বেহেশতের দরজাসমূহের দু’দরজার মধ্যবর্তী স্থানের দূরত্ব হচ্ছে চল্লিশ বছর পথ চলার সমান। আর এটা নিশ্চিত বিষয় যে, এমন একটি দিন আসবে যে, প্রবেশকারীদের প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে এত বড় বিশাল দরজাও সংকীর্ণ হয়ে যাবে। বােখারী ও মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, নবী করীম (সঃ) বলেছেন, যার নিয়ন্ত্রণে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! বেহেশতের দরজাসমূহের দু’দৱজার মধ্যবর্তী দূরত্ব এত বিশাল হবে যেমন মক্কা ও হিজরের মধ্যবর্তী দূরত্ব।

হাদীস থেকে জানা যায় , জান্নাতের আটটি দড়জা থাকবে । কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তার পথে একই রকম দু’টি জিনিস ব্যয় করে। (যেমন- দু’দিরহাম, দুদিনার, দু’টাকা, দুটি কাপড়) তাহলে বেহেশতের দরজাসমূহ হতে তাঁকে আহ্বান করা হবে। সুতরাং যে ব্যক্তি নামাযী ছিল, নামাযের দরজা হতে তাঁকে ডাকা হবে। যে জিহাদ করেছেন, তাকে জিহাদের দরজা হতে ডাকা হবে। সে দানকারী হলে তাকে দানের দরজা হতে ডাকা হবে। সে রােযাদার হলে তাকে বাবে রাইয়ান দরজা হতে ডাকা হবে? একথা শুনে আবু বকর (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কোরবান হােক। সকল দরজা থেকেও কি কাউকে ডাকা হবে। আসলে এর তাে কোন প্রয়ােজন নেই, কেননা মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কোন একটি দরজা দিয়ে প্রবেশ। দরজাসমূহ হতে তাকে আহ্বান করা হবে। সুতরাং যে ব্যক্তি নামাযী ছিল, নামাযের দরজা হতে তাঁকে ডাকা হবে। যে জিহাদ করেছেন, তাকে জিহাদের দরজা হতে ডাকা হবে। সে দানকারী হলে তাকে দানের দরজা হতে ডাকা হবে। সে রােযাদার হলে তাকে বাবে রাইয়ান দরজা হতে ডাকা হবে

বেহেশতীরে প্রথম নাস্তা খাবার

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কেয়ামতের দিন পৃথিবী একটি রুটির মত হয়ে যাবে। আর মহা শক্তিমান ও পরাক্রমশালী সত্তা আপন কুদরতের সাহায্যে তাকে এমন ভাবে ওলট পালট করবেন। তােমরা যেমন পরিভ্রমণের সময় রুটি এপিঠ ও পিঠ করে থাক। আল্লাহ তাআ’লা বেহেশতীদের জন্য পৃথিবীকে প্রথম নাস্তার বস্তুতে পরিণত করবেন (জামউল ফাওয়ায়েদ)। বেহেশতে পানাহারের জন্য থাকবে অফুরন্ত নেয়ামতরাজী। সেখানে অবস্থান নেয়ার পর বেহেশতীগণ নিয়মিতভাবে পানাহার করতে থাকবেন। কিন্তু সর্বাগ্রে প্রথম মেহমানদারীর জন্য তাদেরকে যে নাস্তা প্রদান করা হবে, তা হবে পৃথিবীর রুটি। এ নাস্তা খাওয়ানাের মধ্যে এ ফায়দা নিহিত আছে যে, পৃথিবীতে নানা প্রকার মজাদার জিনিস রয়েছে, যা বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের ফল-মূল শস্য ও সজীসহ অন্যান্য বস্তুতে বিদ্যমান। যেহেতু কোন মানুষই পৃথিবীতে উৎপাদিত সমস্ত নেয়ামত আহার করেনি বরং অনেক ফলমূল ও খাদ্যবস্তু হতে তারা ছিল বঞ্চিত। এ কারণে পৃথিবীকে রুটিতে পরিণত করে বেহেশতীগণকে মােটামুটিভাবে সমস্ত বস্তুর স্বাদ আহরণ করা হবে। ফলে তারা যখন বেহেশতের নেয়ামতসমূহ পানাহার করবে, তখন বাস্তবভাবে সকলের মনে এ বিশ্বাস সৃষ্টি হবে যে, দুনিয়াতে যা কিছুই আমরা আহার করেছি তা বেহেশতের নেয়ামতের তুলনায় কিছুই নয়।

বেহেশতে প্রবেশের পর বেহেশতীদের শুকরিয়া আদায় 

বেহেশতীগণ বেহেশতে প্রবেশের পর আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া জ্ঞাপনে পঞ্চমুখ হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন : “বেহেশতীগণ বলবে, সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার জন্য নিবেদিত, যিনি তার প্রতিশ্রুতিকে আমাদের কাছে সত্য প্রমাণ করেছেন এবং আমাদেরকে এ সুখময় বেহেশতের অধিকারী করেছেন। ফলে বেহেশতের যে স্থানে ইচ্ছে আমরা স্থানগ্রহণ করে নিতে পারি। বাস্তবিকই (পার্থিব জীবনে) উত্তম আলকারীদের জন্য এটা চমৎকার প্রতিদান।” -সূরা যুমার- শেষ কুকু। 
আল্লাহ তাআলা প্রথমত নৈকট্যপ্রাপ্ত লােকদের পুরস্কারের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তাদের মধ্যে বিরাট একটি দল হবে পূর্বকালের অর্থাৎ উম্মতে মােহাম্মদীর আগের জমানার লােক। আর ক্ষুদ্র একটি দল হবে পরবর্তী কালের লােক।  পূর্ব জমানায় অধিক লােক হওয়া এবং পরের জমানায় কম লােক হওয়ার কারণ হচ্ছে, বিশেষ লােকের সংখ্যা প্রত্যেক জমানাতেই কম হয়ে থাকে। যেহেতু নবী করীম (সঃ)-এর পূর্বের সময় কালটি ছিল অনেক অনেক দীর্ঘ। সুতরাং দীর্ঘ এ সময়ে যে পরিমাণ বিশেষ লােক পাওয়া যাবে, তাদের মধ্যে এক লাখ বা দু’লাখই হবেন নবী-রাসূল। আর স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী সে অনুসারে ছােট জমানায় বিশেষ লােকদের সংখ্যা হবে কম।

বেহেশতীদের অবয়ব, পবিত্রতা ও সৌন্দর্য
বেহেশতে সর্বপ্রথম যে দলটি প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা হবে চতুর্দশী পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল। এরপর দ্বিতীয় দলে যারা বেহেশতে প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা হবে উজ্জ্বল তারকার ন্যায় । বেহেশতের সমস্ত লােক একমনা হবে। (তাদের দেহ বিভিন্ন হলেও তারা হবে একমনা এবং পরস্পর ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ ।) তাদের মধ্যে কোন মতানৈক্য থাকবে না এবং তাদের মধ্যে থাকবে না কোন হিংসা-বিদ্বেষ। তাদের প্রত্যেকের জন্য (হুরদের মধ্য থেকে) কম পক্ষে দু’জন স্ত্রী থাকবে। সে স্ত্রীদের প্রত্যেকের পায়ের নলার হাড় মাংসের উপর দিয়ে পরিদৃষ্ট হবে। বেহেশতীগণ সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ তাআলার গুণগানে নিমগ্ন থাকবেন। সেখানে তারা কেউ অসুস্থ হবেন না এবং পায়খানা-প্রস্রাবেরও প্রয়ােজন থাকবে না, তাদের নাক থেকে সর্দিও ঝরবে না। তারা থুথু ফেলবেন না। তাদের আসবাব ও তৈজষপত্রগুলাে হবে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত। হাতের কাঙ্কন হবে স্বর্ণ নির্মিত। তাদের আংটিতে সুগন্ধি প্রবাহিত করার জন্য উদকাঠ প্রজ্জ্বলিত করা হবে। আর তাদের ঘাম মেশকের সুঘ্রাণ যুক্ত হবে। তারা সকলে আদি পিতা হযরত আদম (আ)-এর অবয়ব কাঠামাের অনুরূপ অবয়ব বিশিষ্ট হবে। আর দৈর্ঘ্যে হবে আদম (আঃ)-এর অনুরূপ ষাট গজ (বােখারী, মুসলিম)। বেহেশতীদের আংটিতে থাকবে জ্বলন্ত উদকাঠ। এর অর্থ হচ্ছে উদ্‌কে যদি কাঠ মনে করা হয়, যার দ্বারা সুগন্ধি আগর বাতি বানান হয়। আর এটা খুবই মূল্যবান জিনিস, যা তরল করে ছােট ছােট কাঠিতে মিশিয়ে বাতি জ্বালান হয়। বেহেশতে কোন বস্তুর ঘাটতি থাকবে না। তাই সেখানে সুঘ্রাণের জন্য উদের জ্বলন্ত কাঠ দ্বারা আগরবাতি বানানাের কোন প্রয়ােজন হবে না। এ উদকাঠ দুনিয়ার উদকাঠের মত নয়, আর এ আংটি যে আগুন দ্বারা জ্বলতে থাকবে, অন্য কোন জিনিস দ্বারা সে সম্পর্কে কোন বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়।

বেহেশতীদের দাড়ি থাকবে না, তাদের নয়নযুগল এমন সুন্দর হবে যে, সুরমা লাগান ছাড়াই তা সুরমা বিশিষ্ট হবে। তাদের যৌবন কখনাে বিনষ্ট হবে না এবং তাদের কাপড়ও কখনাে পুরান হবে না (তিরমিযী, দারেমী) । বেহেশতীগণ আজরদ ও আমরদ হবেন। এর অর্থ হচ্ছে তাদের দেহে কোন পশম থাকবে না এবং নারী পুরুষ সকলেই দাড়িহীন হবেন। দেহে পশম না থাকার দুটি অর্থ হয়, একটি হচ্ছে- মাথার চুল ছাড়া দেহের কোন স্থানেই চুল বা পশম থাকবে না। আর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে দেহের যেসব স্থানের চুল কাটতে হয়, যেমন বগল ও নাভীর নীচের চুল। সেসব স্থানে আদৌ কোন চুল থাকবে না। আর বুক ও রানে যে পশম হবে, তা হবে খুবই অল্প ও ছােট ছােট । আর চামড়ার সৌন্দর্য নষ্ট করে এমন ঘন হয়েও তা হবে না। তাদের চিরুণী হবে স্বর্ণ নির্মিত। 

বেহেশতীদের দৈহিক সুস্থতা ও যৌন ক্ষমতা 

হযরত আবু সাঈদ খুদরী ও আবু হােরায়রা (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, বেহেশতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একজন ঘােষক এ ঘােষণা করবেন, হে বেহেশতীগণ! তােমাদের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, তােমরা চির সুস্থ থাকবে। কখনই কোন রােগ-ব্যাধি হবে না। আর এ সিদ্ধান্তও হয়েছে যে, তােমরা চিরঞ্জীব থাকবে। কখনাে তােমাদের মৃত্যু হবে না। তােমরা সর্বদাই জওয়ান থাকবে, কখনাে বৃদ্ধ হবে না। তােমরা সর্বদা আল্লাহ প্রদত্ত অফুরন্ত নেয়ামত ও ভােগ-বিলাসের মধ্যে নিমগ্ন থাকবে। কখনাে কোন জিনিসের জন্য অভাব বােধ করবে না এবং কারাে মুখাপেক্ষীও হবে না।

বেহেশতীদের বয়স 

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, বেহেশতীদের কেউ যখন এ পার্থিব জীবন থেকে চিরবিদায় নেন, সে ছােট হােক কিংবা বড়, যুবক কিংবা বৃদ্ধ, বেহেশতে প্রবেশের সময় সবাকেই ত্রিশ বছর বয়সের ভরা যৌবনের যুবকে পরিণত করা হবে। এ বয়সের সীমা কখনােই বাড়বে না। ত্রিশ বছর বয়সটি হচ্ছে মধ্যম মানের বয়স। এ বয়সে পূর্ণ যৌবন এবং বুদ্ধির পরিপক্কতা দুই অর্জিত হয় পরিপূর্ণরূপে। সতর্কতা, চেতনা, অনুভূতি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুস্থতা থাকে পুরােপুরিভাবে বিরাজমান। তারা সর্বদাই বেহেশতে অবস্থান করবে । কিন্তু কখনাে তারা বৃদ্ধ হবে না এবং তাদের যৌবনেও ভাটা পড়বে না। তাদের চেতনা অনুভূতিতেও কখনাে জড়তা দেখা দেবে না। কখনাে দাঁত পরবে না এবং দৃষ্টি শক্তিতেও কোন বৈপরিত্য দেখা দেবে না। কোন কোন হাদীসে বেহেশতীদের বয়স তেত্রিশ বছরও উল্লেখ করা হয়েছে।

বেহেশতে প্রবেশকারীদের দুটি দল সুরা ওয়াকিয়ায় আল্লাহ তাআলা তিন দল লােকের কথা উল্লেখ করেছেন । অর্থাৎ কেয়ামতের দিন মানুষ তিন দলে বিভক্ত হবে।
১. আসহাবুল ইয়ামীন বা আসহাবুল মায়মানা- অর্থাৎ ডানহাতে আমলনামা প্রাপ্তগণ।
২. মুকাররিবীন অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ যেমন- নবী-রাসূল, সিদ্দীক, শহীদ ও আল্লাহর অলীগণ।
৩. আসহাবুশ শিমাল বা আসহাবুল মাশয়ামা অর্থাৎ বাম হাতে আমলনামাপ্রাপ্তগণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *