দোজখীদের প্রেক্ষাপটের বিবরণ । হাশরের ময়দানের জাহান্নামী মানুষের দিনগুলো । Islamic Story Bangla

দোজখীদের প্রেক্ষাপটের বিবরণ । হাশরের ময়দানের জাহান্নামী মানুষের দিনগুলো । Islamic Story Bangla
পুলসেরাত পার হওয়া ও দোযখে নিপাত
কিছু কিছু মুমিন লোক চোখের পলকে পুলসেরাত অতিক্রম করবে। আর কিছু লােক বিদ্যুতের ন্যায়, কিছু লােক বাতাসের গত্তির ন্যায়, কিছু লােক পাখি উড়ার গতির ন্যায়, কিছু লােক গতিসম্পন্ন ঘােড়ার ন্যায়, কিছু লোক উটের চলার ন্যায়, কিছু লােক দ্রুতবেগে দৌড়ের ন্যায় এবং কিছু লােক পায়ে চলার ন্যায় এবং কিছু লােক শিশুদের চলার ন্যায় পথ অতিক্রম করবে। এদের মধ্যে কিছু লােক নিরাপদে দোযখ হতে নাজাত লাভ করবে । কিছু লােক সাড়াশীর বাঁধন থেকে ছাড়াছাড়ি করে ছুটে যাবে। আর কতককে অধঃমুখী করে দোযখে ধাক্কিয়ে ফেলা হবে। | –মুসলিম, হাকেম, মেশকতা।

দোযখীদের কুৎসিৎ আকৃতি দোযখীদের কুৎসিৎ আকৃতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন  “যারা পাপ অর্জন করে, সে পাপের অনুরূপ। লাঞ্ছনা ও অপমান তাদেরকে ঘিরে ফেলবে। আল্লাহ তাআলার শাস্তি থেকে মুক্ত করার মত তাদের কেউই থাকবে না। তাদের দুরাবস্থা এমন হবে যে, যেন তাদের মুখমণ্ডল কালাে রাতের একটি অংশ দ্বারা আচ্ছাদিত করে দেয়া হয়েছে।” –সূরা ইউনুছ- ৬ রুকু। 

এ আয়াত দ্বারা জানা যায় যে, দোযখীদের মুখমণ্ডল অত্যন্ত কালাে হবে । হাদীসে আছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলেছেন, দোযখীদের কাউকে যদি সেখান থেকে বের করে দুনিয়ায় পাঠান হয়, তাহলে তাদের কুৎসিৎ আকৃতির দৃশ্য এবং দুর্গন্ধের কারণে দুনিয়ার মানুষ অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে।


দোযখীদের অশ্রু 
হযরত আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবা (রা)গণকে সম্বােধন করে বলেছেন, হে লােকেরা! তােমরা কাঁদ। যদি তােমাদের কান্না না আসে, তাহলে কান্নার ভান কর। কেননা দোযখীরা দোযখে এতটা কাঁদবে যে, তাদের অশ্রুতে তাদের মুখমণ্ডলে নালার সৃষ্টি করবে। কাঁদতে কাঁদতে অশ্রু বের হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। অবশেষে রক্ত বের হবে। যার ফলে চোখে জখম ও. ঘা সৃষ্টি হবে । —আবু ইয়ালা, আত্তারগীব অত্তারহীব ।

পবিত্র কোরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা পাপিষ্ঠ, তারা দোযখে এমন অবস্থায় থাকবে যে, তারা সেখানে গাধার ন্যায় চিক্কার দিতে থাকবে। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।”  সূরা হুদ-৯ রুকু।


দোযখ থেকে ছাড়া পাবার জন্য মুক্তিপণ দিতে সম্মত হবে ? 
দোযখের শাস্তি হতে রেহাই পাবার জন্য কাফেরগণ দুনিয়ার সমুদয় সম্পদ মুক্তিপণ দিতে সম্মত হবে । আল্লাহ তাআলা বলেন : “আর জালেমদের (কাফের মুশরেকদের) কাছে যদি দুনিয়ার সমস্ত বস্তু এবং তার সাথে সে পরিমাণ আরও সম্পদ থাকে, তাহলেও কেয়ামতের দিন মর্মান্তিক শাস্তি হবে বাঁচার জন্য দ্বিধাহীন চিত্তে সে তা মুক্তিপণ হিসাবে দিতে সম্মত হবে । -সূরা যুমর ৫ রুকু। | “অপরাধীগণ সেদিনকার শাস্তি হতে বাঁচার জন্য নিজেদের পুত্রসন্তান স্ত্রী ভ্রাতাগণ নিজ সম্প্রদায়ের সে সব লােকজন যাদের মধ্যে তারা বসবাস করত এবং পৃথিবীর সমস্ত বস্তুকে নিজেদের মুক্তিপণরূপে দিতে পছন্দ করবে, যাতে তারা বাঁচতে পারে। কিন্তু তা কখনাে সম্ভব হবে না।” –সূরা মায়ারিজ- ১ম রুকু ।

দুনিয়ায় কাফের মােশরেকগণ মুমিনদেরকে দেখে হাসি-ঠাট্টা ও বিদ্রুপ করত। কোন কোন সময় তাদের অভাব অনটন ও দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে উপহাস করত। কোন কোন সময় তাদের পােশাক-পরিচ্ছদ ও কাপড়-চোপড় দেখে নাক ছিটাত। কোন কোন সময় তাদের নামায ও এবাদত-বন্দেগী দেখেও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ত। ঈমানদারগণকে উপহাসের পাত্রে পরিণত করে এমনভাবে তাতে মশগুল হত যে, তারা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তাআলাকে ভুলে থাকত। সূরা মুমিনুনে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা দোযখীদেরকে সম্বােধন করে বলবেন ?  “আমার বান্দাদের মধ্যে এমন একটি দল ছিল যারা বলত, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি করুণাবর্ষণ করুন। অনুগ্রহকারীদের মধ্যে আপনিই শ্রেষ্ঠ অনুগ্রহকারী। অথচ তােমরা তাদেরকে উপহাস করতে। এমনকি তারা আমার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়াসত্ত্বেও তােমরা তাদেরকে দেখে হাসাহাসি করতে। আজ আমি তাদেরকে তাদের ধৈর্যের প্রতিদান দিয়েছি যে, তারাই হচ্ছে সফলকাম।”  সূরা মুমিনুন- শেষ রুকু। 


নেতাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি আবেদন 
কাফেরগণ তাদের লিডার বা নেতাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে আবেদন পেশ করবে । আল্লাহ তাআলা বলেন :  “যেদিন তাদের মুখমণ্ডল আগুনে ওলট-পালট করা হবে, সেদিন তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহ তাআলাকে এবং রাসূলকে মানতাম। তারা আরও বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের কথা মেনে চলতাম এবং তাদের আনুগত্য করতাম। তাই আমাদেরকে তারা সত্য পথ হতে বিভ্রান্ত করেছে। হে আমাদের প্রতিপালক! ওদেরকে আপনি দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদের প্রতি বর্ষণ করুন বিরাট অভিসম্পাত।” –সূরা আহযাব- ৮ রুকু।


জাহান্নাম প্রহরীদের কাছে আবেদন-নিবেদন 
দোযখীগণ দোযখের শাস্তি ভােগে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট পেয়ে জাহান্নাম প্রহরীদের কাছে শান্তি লাঘবের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার আবেদন-নিবেদন জানাবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআ’লা বলেন : “তােমরা তােমাদের প্রতিপালকের কাছে (আমাদের জন্য এ মর্মে) সুপারিশ কর যে, তিনি যেন কোন এক দিনের জন্য আমাদের শাস্তিকে হালকা করে দেন?” তারা বলবে, “তােমাদের কাছে কি তােমাদের রাসূলগণ মুজিযা ও দলিল প্রমাণ নিয়ে এসেছিল না ?” জওয়াবে দোযখীরা বলবে, হা নিশ্চয় এসেছিল, কিন্তু আমরা তাদের কথা মানিনি। তখন ফেরেশতাগণ বলবে ? “তবে (আমরা তােমাদের জন্য দোয়া করতে পারব না) তােমরাই দোয়া কর । (তাদের দোয়াতেও কোন উপকার হবে না। কেননা পরকালে কাফেরদের দোয়া নিস্থল ও ব্যর্থ হবে “(সূরা মুমিন- ৫ রুকু) ।

এরপর দোযখের প্রধান কর্মকর্তা মালেক ফেরেশতার কাছে তারা আবেদন করে বলবে ? “হে মালেক! তুমি তােমার প্রতিপালকের কাছে দোয়া কর, যাতে তিনি মৃত্যু দান করে আমাদেরকে চিরতরে শেষ করে দেন।”  তখন মালেক ফেরেশতা বলবে ? তােমরা সর্বদ্রাই এ অবস্থায় থাকবে (তােমরা এ শাস্তি হতে মুক্তি পাবে না এবং মারা যাবেও না।) 

এরপর মালেক ফেরেশতা তাদেরকে বলবেন, তােমরা সরাসরিই আল্লার তাআলার কাছে আবেদন ও দোয়া কর। কেননা তার চেয়ে বড় আর কেউ নেই। তাই কাফেরগণ আবেদন করে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুর্ভাগ্যই আমাদেরকে আবেষ্টন করে ফেলছিল। আমরা বিভ্রান্ত সম্প্রদায় ছিলাম। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এখান থেকে বের করুন। আমরা পুণরায় যদি কুফরী করি, তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা অপরাধী ও জালেম গণ্য হব। এর উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলবেন, “তােমরা এখানে লাঞ্ছিত অবস্থায়ই অবস্থান কর। তােমরা আমার সাথে কথা বল না।” সূরা মুমিনুন শেষ রুকু

হযরত আবুদারদা (রা) বলেন, আল্লাহ তাআলার এ উত্তর শুনে কাফেরগণ সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হবে এবং গাধার ন্যায় চিৎকার করতে থাকবে এবং দুঃখ ও অনুশােচনা করতে থাকবে। -তিরমিযী, মেশকাত

মােটকথা সচেতন মানুষ সে-ই, যে নিজের পরকালের জীবন গঠনে এবং গুনাহের মাধ্যমে দু’চার দিনের ধন-সম্পদ মান-সম্মান শাসনক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে নিজকে দোযখের পাত্রে পরিণত না করে। পরকালে যখন কঠিন শাস্তিতে নিপতি হবে, তখন অনুশােচনা করায় কোনই ফলােদয় হবে না। বেহেশতের ন্যায় চির সুন্দর ও শান্তিময় স্থান লাভ করা সম্পর্কে উদাসীন হওয়া এবং চির অশান্তি ও দুঃখ-বেদনাপূর্ণ স্থান দোযখ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন চিন্তা না করা নির্বোধের কাজ ছাড়া কিছু নয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তােমরা যতটা সম্ভব বেহেশতের সন্ধান কর, এবং যতটা সম্ভব দোযখ হতে দূরে পালাও। কেননা যে তােক বেহেশতের সন্ধানী হয় এবং দোযখ হতে ভয়ে পালায়, তার কখনাে চিন্তাহীন নিদ্রা হতে পারে না। 


দোযখ হতে রক্ষা পাওয়ার কিছু দোয়া
১. হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবী (রা)গণকে যেভাবে কোরআন মজীদের সূরা শিক্ষা দিতেন, এ দোয়াটিও অনুরূপ গুরুত্বের সাথে শিক্ষা দিতেন। -মুসলিম।
অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দোযখের শাস্তি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আরও আশ্রয় প্রার্থনা করছি কবর আযাব থেকে। দাজ্জালের জীবন ও মৃত্যুর ফেত্না হতে। -মুসলিম। 
২. হযরত আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) খুব বেশি বেশি করে এ দোয়া করতেন ? হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ দান আর আগুনের আযাব থেকে পরিত্রাণ দান করুন। বােখারী, মুসলিম
৩. রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিম নামক এক সাহাবীকে বলেছেন, মাগরিব নামাযের পর কারাে সাথে কথা বলার পূর্বে সাতবার এ দোয়া পাঠ করবে ? “হে আল্লাহ আমাকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করুন।” এ দোয়া পাঠ করার পর যদি ঐ রাতে তােমার মৃত্যু হয়, তাহলে দোযখের আযাব থেকে তােমাকে মুক্তি দেয়া হবে। আর ফজর নামাযের পর কারাে সাথে কথা না বলে এ দোয়া সাতবার পাঠ করলে ঐ দিন যদি তােমার মৃত্যু হয়, তাহলে অবশ্যই তােমাকে দোযখ থেকে মুক্তি দেয়া হবে। নাসায়ী, আবু দাউদ, আততারগীব
৪. রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কোন ব্যক্তি তিনবার আল্লাহ তাআ’লার কাছে বেহেশতের প্রার্থনা করলে বেহেশত তার জন্য এ দোয়া করে ? “হে আলাহ! একে বেহেশতে দাখিল করুন।” আর কোন ব্যক্তি তিনবার আল্লাহর কাছে দোযখের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করলে দোযখ তার জন্য এ দোয়া করে “হে আল্লাহ! একে দোযখের আগুন হতে বাঁচান।” –তিরমিযী। 

এখানেই শেষ করছি। চক্ষুসমানদের জন্য অল্পই যথেষ্ট, কিন্তু গাফেলদের জন্য গাদা গাদা পুস্তকও কিছু নয়। সর্বশেষ পাঠকবর্গের কাছে এ ফকীর ও অধমের জন্য এবং আমার পিতা সুফী মুহাম্মদ সাদেক (র)-এর জন্য দোযখের আগুন থেকে মুক্তি ও বেহেশতুল ফেরদাউস লাভের জন্য দোয়া করার আবেদন পেশ করছি।


Leave a Comment