পৃথিবীর জন্ম রহস্য ও বিজ্ঞানের উদঘাটন

পৃথিবীর জন্ম-রহস্য আবিষ্কার

পৃথিবী নামক একটি গ্রহের বাসিন্দা আমরা। এই মহাবিশ্বে পৃথিবীর মত এ রকম আরাে একটি গ্রহ আছে কিনা কিংবা থাকলে, সেখানে মানুষ বা মানুষের মত বুদ্ধিমান প্রাণী আছে কিনা তা এখনও জানা যায়নি। সুতরাং এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ধরে নিতে পারি মহাকাশে কোটি কোটি গ্রহ তারা নক্ষত্রের মধ্যে, আমাদের পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যেখানে বহু বিচিত্রভাবে প্রাণের বিকাশ ঘটেছে এবং তার চেয়েও বড় কথা, এখানে মানুষের উদ্ভব হয়েছে- যে মানুষ আপন বুদ্ধির জোরে সৃষ্টির রহস্য ভেদ করতে চাইছে। সুতরাং যতটা সম্ভব গুরুত্ব দিয়েই আমরা এই সুন্দর পৃথিবীটাকে এই আলােচনার মাধ্যমে চিনতে চেষ্টা করব।

যে কোন বস্তুরই উৎপত্তি ক্ষয় ও বিকাশের ধারাবাহিক একাধিক ইতিহাস আছে। মহাবিশ্বের কোথাও এমন কোন বস্তু বা বস্তুপূঞ্জ নেই, যা চিরকাল একই রকম অবস্থায় রয়ে গেছে বা ভবিষ্যতেও একই রকম থেকে যাবে। আমাদের পৃথিবীও যেহেতু একটি বস্তুপিণ্ড, সুতরাং তারও উপাত্ত হয়েছে একদিন, আবার বিভিন্ন পরিবর্তনের পর একদিন তা বিনাশ প্রাপ্তও হবে।

পণ্ডিতেরা বলেন একেবারে আদিতে কিছুই ছিল না। তাঁদের মতে, সষ্টির আদিতে এই বিশ্বের সমস্ত পদার্থ, অন্য রূপে, একটি মহা ডিম্বের আকার ধারণ করে ছিল। অকল্পনীয় উত্তাপে সেই ডিমটি ফেটে যায়, এবং তার থেকে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ইত্যাদির সৃষ্টি হয়, গড়ে ওঠে অজস্র নক্ষত্র, এবং ধীরে ধীরে অন্যান্য পদার্থসমূহেরও সৃষ্টি। ভবিষ্যতে এই মহাবিশ্ব আবার লয়প্রাপ্ত হবে এবং ফিরে যাবে একেবারে আদিতে যেমন ছিল তেমনি অবস্থায়।

অনুমান করা হয় বারশাে কোটি বছর আগে এই বিস্ফোরণ হয়েছিল। সেই সময় বহু নক্ষত্রের জন্ম হলেও আমাদের সূর্যের তখনও জন্ম হয়নি। পরে মহাকাশে ঘূর্ণায়মান বহু কোটি মাইল ব্যাপী বিশাল বিশাল ধুলাের মেঘ একত্রিত হয়ে সূর্যের জন্ম হয়েছিল। এই ঘটনা একদিনে হয়নি। হয়ত কোটি কোটি বছর সময় লেগেছিল এর জন্য। এই সময় সূর্য ছিল একা। যেমন বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি বা চন্দ্র তাদের জন্মই হয়, তখনও।

অনুমান করা হয় প্রায় সাড়ে চারশাে কোটি বছর বা তারও কিছু আগে পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহের জন্ম হয়েছিল। এই জন্ম কিভাবে সম্ভব হয়েছিল তা নিয়ে পণ্ডিত মহলে বিস্তর বাদানুবাদ আছে। আমরা কয়েকটি প্রধান মত নিয়েই এখানে আলােচনা করব শুধু।

ইমানুয়েল কান্ট ও লাপলাসের মতবাদ

প্রথমেই আমরা আলােচনা করব ইমানুয়েল কান্ট ও লাপলাসের মতবাদ। নিয়ে। ইমানুয়েল কান্ট কল্পনা করেছিলেন বিশ্বের সমস্ত বস্তুর উৎপত্তি হয়েছে এক আদি নীহারিকা থেকে। মহাকাশে ঘুর্ণায়মান লক্ষ লক্ষ মাইল ব্যাপী ধূলাের মেঘ একত্র হয়ে এই নীহারিকা গড়ে তুলেছিল। পরে মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নীহারিকার মধ্যে বিভিন্ন অণু পরমাণু যতই পরস্পরের নিকটবর্তী হয়েছে, ততই পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে এবং তাদের গতিশীলতা থেকে উদ্ভুত শক্তি তাপে রূপান্তরিত হয়ে তাদের গতিশীলতাকে আরাে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে একদিকে যেমন সংঘর্ষের মাত্রা বেড়েছে তেমনি বেড়েছে। নীহারিকার ঘূর্ণনের বেগ। এইভাবে চলতে চলতে এক সময় প্রচণ্ড উত্তাপে নীহারিকার মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটে এবং নীহারিকা থেকে বস্তুপুঞ্জ বিচ্ছিন্ন হয়ে এই জগৎ গড়ে তােলে। অর্থাৎ মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল যেভাবে, সেই একই প্রক্রিয়ায় আমাদের এই সৌরজগৎও গড়ে উঠেছিল। কাণ্ডের মতবাদ আপাতদৃষ্টিতে যক্তিগ্রাহ্য মনে হলেও, পরবর্তী কালের। অনেক আবিষ্কার এই মতবাদের অযৌক্তিকতা প্রকট করে তুলেছে।

শাপলাসের মতবাদ

কাণ্টের এই মতবাদের পরেই যার নাম করতে হয় তিনি ফরাসী জ্যোতির্বিজ্ঞানী লাপলাস। যাঁর মতে, আদিতে ছিল শুধু অতিকায় এক নীহারিকা। যা থেকে সূর্যের জন্ম হয়েছে। এই আদি নীহারিকা যা সূর্য আকারে ছিল অনেক বড় এবং বর্তমান সূর্যের চেয়েও অনেক বেশি উত্তপ্ত । বহু লক্ষ বছর ধরে ধীরে ধীরে সেই উত্তাপ কমে। এলে তার আয়তন কিছুটা ছােট হয়ে যায় ফলে নিজের অক্ষের। চারিপাশে নীহারিকাটির ঘূর্ণনের বেগ বেড়ে যায়।

এইভাবে যত দিন যেতে লাগল, নীহারিকাটির নিজের চারিপাশে ঘােরার বেগও তত বেড়ে গেল এবং সেটি আরাে ছােট হতে লাগল। এখন এক বস্তা বালি একটা ব্যাগে পুরে বো বোঁ করে ঘােরালে কি হবে? তার ওপর ব্যাগটা যদি ক্রমশ আরাে ছােট হতে থাকে তখন? হ্যা, আদি নীহারিকার ক্ষেত্রেও তাই হল- অর্থাৎ তার বাইরের কিছু অংশ মূল। নীহারিকা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল কিন্তু মহাকর্ষ বলের জন্য মহাশূন্যে। মিলিয়ে যেতে পারল না, তাল পাকিয়ে নীহারিকারই চারপাশে ঘুরতে লাগল। এইভাবে একে একে বিভিন্ন গ্রহ উপগ্রহগুলাে গড়ে উঠল।

লাপলাসের এই মতবাদ একসময় বিজ্ঞানী মহলে বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করেছিল, কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পরে এই মতবাদ পরিত্যক্ত হয়েছে। কিন্তু এ সত্বেও লাপলাস ও কাণ্টের মতবাদের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল। এই দুই মতবাদে আকস্মিক ঘটনার কোন স্থান নেই। এঁদের মতো বিশ্বজগতের উৎপত্তি ও বিকাশ হয়েছে সুশৃঙ্খলভাবে, ধীরে ধীরে একটা নিয়মের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকে জ্যোতিবিজ্ঞানীরা সৌরজগতের উৎপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্য নিলেন। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির মূল কথা হল, সুদূর অতীতে সূর্যের চেয়েও বড় কোন নক্ষত্রের সঙ্গে সূর্যের সংঘর্ষ হয়েছিল আর তার ফলে এই সৌরজগতের উৎপত্তি সম্ভব হয়েছিল ।

চেম্বারলিন ও মমালটনের মতবাদ

১৯০০ সালে টি.সি. চেম্বারলিন এবং এফ. মােলটন সৌরমণ্ডলের উৎপত্তি বিষয়ে একটি নতুন মতবাদ খাড়া করেন। এই মতে, সুদূর অতীতে সূর্যের উপরিভাগে ভীষণ ঝঞ্জা ও আগুনের ঢেউ ছাড়াও মাঝে মাঝে প্রচণ্ড গতিতে জ্বলন্ত পদার্থ মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ত। সেই সময় কোন একটি অতিকায় নক্ষত্র সূর্যের কাছ দিয়ে যাবার সময়, নক্ষত্রটির মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সূর্যের উপরিভাগে অগ্নিঝড় ও অগ্ন্যুৎপাতের পরিমাণ অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। বিশাল একটি নক্ষত্র তাে সূর্যের পাশ দিয়ে চোখের নিমেষে চলে যেতে পারে না। সেটি বেশ ধীরে ধীরে সূর্যের পাশ দিয়ে গেছিল। ফলে সূর্যের বুকে অগ্নি-ঝড় এবং অগ্ন্যুৎপাত অনেক দিন ধরে চলেছিল। তারপর নক্ষত্রটি যখন সূর্যের সবচেয়ে কাছে এল, তখন সেই নক্ষত্রটির প্রচণ্ড মহাকর্ষের টানে সূর্য থেকে দুটি অংশ দুদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিশাল নক্ষত্রটি সূর্য থেকে দূরে লে যাবার পর ঐ বিচ্ছিন্ন অংশ দুটি সূর্যের চারিদিকে ঘুরতে থাকে, তারপর মশ উষ্ণতা হ্রাস পাবার পর ঘুর্ণায়মান গ্যাসীয় পিণ্ডগুলি ঘনীভুত হয় এবং গ্রহ-উপগ্রহের উৎপত্তি হয়।

স্যার জেমস জিনস্-এর মতাবদ

চেম্বারলিন ও মােলটনের তত্ব বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মেনে নিয়েছিলেন। | ১৯১৬ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞানী জেমস্ জিনস্ এই তত্ত্বকে সামান্য একটু পরিবর্তিত করে একটি নতুন মতবাদ গড়ে তােলেন। তাঁর মতে, আগন্তুক নক্ষত্রের মহাকর্ষ বলের জন্য সূর্য থেকে কিছুটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে এসেছিল ঠিকই, তবে তা দুদিকে নয়, একদিকে এবং বিচ্ছিন্ন। অংশটার আকৃতি ছিল পটলের মত। অর্থাৎ, দুদিকটা সরু এবং মধ্যিখানটা চওড়া। এরপর আগন্তুক নক্ষত্রটি দূরে চলে যাবার পর পটলের আকৃতির গ্যাসীয় পিণ্ডটা সূর্যের চারপাশে ঘুরতে থাকে। তারপর উষ্ণতা কমার ফলে পিণ্ডটি ঘনীভুত হয়। এবং নিজের মহাকর্ষের জন্যই ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে গ্রহ উপগ্রহের সৃষ্টি হয়। গ্যাসীয় পিণ্ডটি যেহেতু পটল আকৃতির ছিল, তাই মাঝখানের গ্রহগুলি অর্থাৎ বৃহস্পতি ও শনি- আকারে বড়, এবং সূর্যের একেবারে নিকটে যা দূরের দিকে যে গ্রহগুলাে রয়েছে সেগুলাে অপেক্ষাকৃত ছােট আকারের। যথা বুধ, শুক্র, নেপচুন ও Pluto।।

জিনসের এই মতবাদ প্রথম দিকের বিজ্ঞানী মহলে বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করে ছিল, কিন্তু পরে এর মধ্যেও বিজ্ঞানীরা নানা ত্রুটি বিচ্যুতি লক্ষ্য করেছেন। যেমন একটি প্রশ্ন হল, সূর্য দেহ থেকে পটল আকৃতির যে গ্যাসীয় পিণ্ডটি বিচ্ছিন্ন হয়েছিল তার উঞ্চতা ছিল (জিসের মতে) দশ মিলিয়ন (১০,০০০,০০০) ডিগ্রি। ঐ অকল্পনীয় উষ্ণতায় গ্যাসীয় পিণ্ডের বেশির ভাগটাই নিশ্চয়ই ঘনীভূত হবার পরিবর্তে মহাশূন্যে মিলিয়ে যেত। আর যদি ধরেই নেওয়া হয়, তুলনামূলক ভাবে ভারি পরমাণুগুলি (যেমন হাইড্রোজেনের তুলনায় অক্সিজেন ভারি, অক্সিজেনের তুলনায় সীসা ভারি) ঘনীভূত হয়েছিল, তাহলে পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহগুলােতে হাইড্রোজেন গ্যাস (সবচেয়ে হালকা) থেকে গেল কি করে? জিন্‌সের মতবাদ এই প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারে না।

রাসেল ও লিটনটনের মতবাদ

১৯৩৬ সালে অধ্যাপক এইচ. এন. রাসেল এবং আর. এ. লিটনটন একটি নতুন মতবাদ খাড়া করেন। তাঁদের মতে, সুদূর অতীতে সূর্যের একটি যমজ নক্ষত্র ছিল বলে ধরা হয়। এটা অবশ্য খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। আকাশে এ রকম বহু যমজ বা যুগ্ম তারা রয়েছে। তারা পরস্পর পরস্পরকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খায়। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন প্রতি তারার মধ্যে একটি তারা হল যমজ তারা। আর অতিকায়। আগন্তুক নক্ষত্রটির সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছিল সূর্যের নয়, সূর্যের সঙ্গী নক্ষত্রটির। ফলে সেই নক্ষত্রটি ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে যায় এবং তা থেকেই গ্রহ উপগ্রহের সৃষ্টি হয়।

এই মতবাদটিও প্রথমে সমাদর পেয়েছিল বিজ্ঞানী মহলে, কিন্তু পরে এটির মধ্যে নানা ত্রুটি বিচ্যুতি লক্ষ্য করেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল আগন্তুক কোন নক্ষত্রের সঙ্গে সূর্য বা সূর্যের কোন একটি নক্ষত্রের সংঘর্ষের প্রশ্নটিই বিজ্ঞানীরা বাতিল করে দিতে চাইছেন। কেননা মহাকাশের আয়তনের তুলনায়, নক্ষত্রের সংখ্যা খুবই কম। সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্রের (সূর্য বাদে) দূরত্ব হল ২৫ মিলিয়ন মিলিয়ন মাইল (বা ২৫,০০০,০০,০০০,০০০ মাইল)। এ হল সবচেয়ে কাছে যেটি রয়েছে। বেশিরভাগ তারাই এত দূরে দূরে রয়েছে, যার তুলনায় এই দূরত্ব কিছুই নয়। হিসেব কষে দেখা গেছে এই বিশাল দূরত্বে ছড়িয়ে থাকা কোন নক্ষত্রের সঙ্গে সূর্যের সংঘর্ষ ঘটার সম্ভাবনা ৬০০,০০০ মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের মধ্যে মাত্র একবার। এমন কি দুটো নক্ষত্র যে কাছাকাছি আসবে সে সম্ভাবনাও ৫০০,০০০ মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের মধ্যে মাত্র একবার । অথচ একটা নক্ষত্রের গড় পরমায়ু ১০,০০০ মিলিয়ন বছর। সুতরাং আগন্তুক নক্ষত্রের সঙ্গে সূর্যের সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহের জন্ম হয়েছিল-এই মতবাদ বাতিল বলেই গণ্য করা যেতে পারে।

উইৎসেকার ও হয়েলের মতবাদ

উইৎসেকারের মতে, সুদূর অতীতে সূর্যের চারিপাশে Pluto যত দ অবস্থিত, প্রায় ততদূর পর্যন্ত কোটি কোটি টন গ্যাসীয় অণু ও সূক্ষ্ম ধুলি ছড়িয়ে ছিল- যাদের সম্মিলিত ভরের পরিমাণ সূর্যের ভরের দশ ভাগের এক ভাগ। এই অণু ও ধূলিকণাগুলাে মহাকর্ষর্বলের প্রভাবে সূর্যের চারিপাশে আবর্তিত হচ্ছিল। এইভাবে নির্দিষ্ট একটি সীমার মধ্যে আবর্তিত হবার ফলে গ্যাসীয় অণু ও ধুলিকণাগুলাের মধ্যে অনবরত সংঘর্ষ হচ্ছিল। এই সংঘর্ষের ফলে ধূলিকণা ও গ্যাসীয় অণুগুলাে একত্রিত হতে শুরু করল এবং সেইসঙ্গে তাদের মহাকর্ষ বলও বৃদ্ধি পেল। ক্রমশ তাদের শরীর এমন ভাবে বেড়ে উঠল যে, আশেপাশের সমস্ত গ্যাসীয় অণু ও ধুলিকণাকে আত্মসাৎ করে নিল তারা এবং এইভাবেই সৃষ্টি হল গ্রহ উপগ্রহের। উইৎসেকারের এই মতবাদের মধ্যেও বিজ্ঞানীরা নানা ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন। যে কারণে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেড হয়েল সম্পূর্ণ নতুন একটি মতবাদ গড়ে তলেছেন। তাঁর মতবাদ বলয় তত্ব বলে পরিচিত।

ঐ তত্ত্বে বলা হয়েছে, কোটি কোটি মাইল বিস্তৃত বিশাল এবং গ্যাসীয় স্তপ থেকে সূর্যের জন্ম হয়েছিল। আভ্যন্তরীণ কারণে গ্যাসের স্তুপটি আবর্তন শুরু করে যার অনিবার্য ফল সংকোচন। এইভাবে বহু সহস্র বছর কেটে যাবার পর স্তুপটির ঘনত্ব এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে সঙ্কোচনের মাত্রা এমনভাবে বেড়ে চলল সে স্তুপটি বর্তুলাকার প্রাপ্ত হল । অর্থাৎ দুই মেরু চেপে ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং মধ্যস্থল স্ফীত হয়ে উঠল । এইভাবে আরাে বহুকাল কেটে যাবার পর মধ্যস্থল এত স্ফীত হয়ে উঠল যে, সুর্য আর ধরে রাখতে পারল না তাকে। বলয় আকারে বিচ্ছিন্ন হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ল। সূর্যের চারিদিকে। তারপর ধীরে ধীরে সুর্যের আকর্ষণ বলকে ছিন্ন করে। দূরের দিকে পাড়ি জমাল।

উত্তপ্ত এই বলয়ের মধ্যে গ্যাসীয় অবস্থায় হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন, হিলিয়াম প্রভৃতি মৌলিক পদার্থ ছাড়াও বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগ, যেমন আমােনিয়া, মিথেন ও নানারকম ধাতুও গ্যাসীয় অবস্থায় মিশে ছিল। বলয়টি যতই দূরে সরতে লাগল, ততই তার তাপমাত্রা কমতে লাগল । যে সমস্ত মৌলিক পদার্থ ঐ তাপমাত্রার মধ্যেও কঠিন বা তরল অবস্থায় ছিল, তারাই প্রথমে বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সূর্যকে ঘিরে উপবৃত্তাকার পথে পাক খেতে আরম্ভ করল, এবং ক্রমশ আরাে অধিকসংখ্যক কণা একত্রিত হয়ে। গ্রহ উপগ্রহ ইত্যাদি সৃষ্টি করল।

হয়েলের এই বলয় মতবাদের মধ্যেও বিজ্ঞানীরা অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ্য করেছেন। কিন্তু এর থেকেও অধিকতর যুক্তিসম্মু মতবাদ যত দিন না। পাওয়া যাচ্ছে ততদিন বলয় মতবাদ মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

Leave a Comment