বিচারের দিনে শাফায়াত ও আল্লাহর দয়া Islamic Story Bangla

বিচারের দিনে শাফায়াত ও আল্লাহর দয়া Islamic Story Bangla

শাফাআতের বিবরণ

মহাবিচারের দিন আল্লাহ তাআলা নবী, রাসুল, শহীদ ও হক্কানী ওলামাগণকে শাফাআত করার অনুমতি প্রদান করবেন এবং তাদের শাফাআ’ত কবুল করবেন। ফলে অনেক সুনাহগার ঈমানদার লােক তালের শাফাআ’ত আল্লা উপকৃত হবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মহাবিচারের দিন তিন শ্রেণীর লােকেরা শাফাআ’ত করার অনুমতি গাত করবেন। তারা হলেন- (১) নবী রাসূলগণ (২) হক্কানী ওলামায়ে কেরাম (৩) এবং শহীদগণ। —ইবনে মাজা, মেশকাত।
শাফাআতের অনুমতি প্রসঙ্গে কোরআন মজীদের আয়াতুল কুরসীতে আল্লাহ বলেছেন “এমন কে আছে যে, আল্লাহ তাআলার অনুমতি ছাড়া, তার কাছে শাফাআত করতে পারে?

আল্লামা মােল্লা আলী ক্বারী (র) তদ্বীয় মেরকাত শরহে, মেশকাত গ্রন্থে লিখেছেন যে, কেয়ামতের দিন পাঁচবারে শাফাআত হবে। সর্বাগ্রে শাফাআত হবে হাশর ময়দানে জমায়েত হওয়ার পর হিসাব নিকাশ গ্রহণের জন্য। তখন সমস্ত নবী রাসূলগণ আল্লাহ তাআ’লার কাছে শাফায়াত করতে অস্বীকার করবেন। তখন আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আগের পরের সমস্ত মুসলমান ও কাফেরদের হিসাব গ্রহণের জনা আল্লাহ তাআ’লার কাছে সুপারিশ করবেন ।

দ্বিতীয় বার শাফাআ’ত হবে অগণিত মুমিন বান্দাকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবার জন্য। এ শাফাআত করবেন আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) । তৃতীয় বার শাফাআ’ত হবে সেসব ঈমানদারদের জন্য, যারা নিজেদের খারাপ আমালের কারণে জাহান্নামে যাওয়ার পাত্র হবে। এ শাফা’আত ও করবেন আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এবং অন্যান্য ওলামা ও শহীদগণ । চতুর্থবার শাফাআ’ত হবে সেসব গুনাহগার ঈমানদারদের জন্য, যারা শুনাহের কারণে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। তাদের জাহান্নাম হতে বের করার জন্য নবী রাসূলগণ, ফেরেশতা, ওলামা ও শহীদগণ শাফাআত করবেন। আর পঞ্চমবার শাফাআ’ত হবে, জান্নাতী লােকদের মরতবা বৃদ্ধির জন্য । —শরহে মুসলিম, নববী।

যেহেতু নবী করীম (সঃ) প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে শাফাআ’ত করার মধ্যেই উম্মতের জন্য বেশি ফায়দা লক্ষ্য করেছেন, তাই তিনি শাফায়াতের এখতিয়ানকেই গ্রহণ করেছেন। হযরত আবু হোরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, প্রত্যেক নবীকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তার একটি দাবী গ্রহন করার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক নবী দুনিয়াতেই সে বাণীর জন্য দােয়া করে তা কবুল করিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আমি সে দাবী দুনিয়ায় দোয়া করেই শেষ করিনি, বরং সে দোয়াকে আমি কেয়ামতের দিন পর্যন্ত গোপন করে রেখেছি। আর সেদিন আমি সে দেয়া উমতের শাফাআতের কাজে ব্যবহার করব। সুতরাং আমার শাফাআ’ত অবশ্যই আমার সেশন উম্মতে ধান্য হবে, যাদের মৃত্যু হয়েছে আল্লাহ তাআ’লার সাথে কাউকে শরীক না করা অবস্থায়। —মুসলিম।

এ হাদীস দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, প্রত্যেক নবীকেই আল্লাহ তাআ’লা পক্ষ থেকে বিশেষভাবে একটি এখতিয়ার দান করা হয়েছে। তা হশ্নে তাঁর বিশেষ কোন ব্যাপারে দােয়া করলে আল্লাহ তাআলা তাঁদের দোয়া কবুল করবেন সে দোয়া যে জন্যই হােক না কেন। 

হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আমি আমার উম্মতের জন্য শাফাআ’ত করতে থাকব এবং আল্লাহ তাআ’লাও আমার শাফা’আত কবুল করতে থাকবেন। অবশেষে আমার প্রতিপালক আমার নিকট জিজ্ঞেস করবেন, হে মুহাম্মদ! তুমি কি সন্তুষ্ট হতে পেরেছ ? আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক! আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। -আত্ত্বিারগীব অারহীব, তাবারানী, আল বাহার।
হযরত ইবনে আবাস (রা) বলেন, নবী করীম (সঃ) বলেছেন, কেয়ামতের দিন নবী-রাসূলদের জন্য নূরের মিম্বর হবে এবং তাতে তারা উপবিষ্টও হবেন ! কিন্তু আমার মিম্বরটি খালি থাকবে। আমি তাতে বসব নয়। কারণ আমি বসলে আমাকে তৎক্ষণাৎ জান্নাতে প্রেরণ করা হয় নাকি এবং আমার অবর্তমানে আমার উম্মতের কি অবস্থা হবে, তখন আল্লাহ তাআ’লা বলবেন, হে মুহাম্মাদ! তুমি তোমার উম্মতের ব্যাপারে আমার কাছে কি চাও ? আমি বলব, আপনি তাদের হিসাব-নিকাশ দ্রুত করুন। অতঃপর আমার উম্মতকে ডেকে তাদের হিসাব-নিকাশের কাজ শুরু হবে। ফলে তাদের মধ্যে কিছু লােক আল্লাহর অনুগ্রহে, জান্নাতে প্রবেশ করবে। তখন তাদের জন্য অতিরিক্ত কোন সুপারিশের প্রয়োজন হবে না। আর কিছু লােক আমার শাফাআতের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি কেবল সুপারিশ করতেই থাকব। অবশেষে আমার উম্মতে মধ্যে যাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে, তাদেরকে বের করার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ হাতে আমার কাছে তাদের নামের একটি তালিকা প্রদান করা
হবে। অবশেষে জাহান্নামের প্রধান মন্তকর্তা ফেরেশতা মালেক আমাকে বলবেন, আপনার উম্মতের মধ্যে যারা জাহান্নামে প্রবিষ্ট হয়েছিল তাদের সবাইকেই আপনি বের করে নিলেন, কাউকেই আর আল্লাহর ক্রোধানলে রাখলেন না। –তাবরানী, বায়হাকী, আত্রারগীব অত্তারহীব।

মুমিনগণের শাফাআতের মর্যাদা লাভ 

মহানবী (সঃ)-এর শাফাআত হচ্ছে উন্মত্তের জন্য এক বিরাট রহমত বিশেষ। তারই বদৌলতে তার উম্মতের বহু গুণী ব্যক্তি মহাবিচারের দিন শাআ’ত করার গৌরবময় সম্মান লাভ করবেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, নিঃসন্দেহে আমার উতের কিছু লোক বিরাট বিরাট দলের জন্য শাফাআতকারী হবে। কিছু কিছু লােক শাফাআ’ত করবে কেবল একটি মাত্র গােত্রের জন্য। আর কিছু কিছু লােক শাফাআ’ত কৱবে এক উস বা ক্ষুদ্রকায় দলের লােকদের জন্য। (দশ থেকে চল্লিশ জনের দলকে উস বলা হয়।) আর কিছু কিছু লোক মাত্র এক ব্যক্তির জন্য শাফায়াত করবে। অবশেষে আমার সমগ্র উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। –তিরমিজি, মেশকাত ।

আর এক হাদীসে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সঃ) বলেছেন, আমার উমতের এক ব্যক্তির শাফাআতের ফলে বনী তামীম গােত্রের লােকদের চেয়েও
অধিকসংখ্যক লােক ঝান্নাতে প্রবেশ করবে । -তিরমিযী, ইবনে মাজা, মেশকাত।

অভিশাপকারীগণ শাফাআত করার মর্যাদা হতে বঞ্চিত হবে

হযরত আবু দারদা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যাদের অভিশাপ করা অভ্যাস রয়েছে, তারা কেয়ামতের দিন কোন সাক্ষী হবে না এবং তারা শাফাআত করার মর্যাদা লাভ করবে না। অর্থাৎ, এ বদঅভ্যাসের কারণে তাদেরকে সাক্ষী হওয়া শু শাফাআতের পদমর্যাদা হতে বন্দি করা হবে। —তিমির্শী, ইবনে মাজা, মেশকাত্ম।

মুজাহিদগণের শাফাআত ?

তিরমিযী শীরফে এক দীর্ঘকায় হাদীস রয়েছে, যার বর্ণনাকারী হানেহযরত মেকদাম ইবনে মায়াদি ইয়াকরাব (রা) । তিনি বলেন, নবী করীম (সঃ) শহীদগণের মহত্ত্ব ও ফজিলত বর্ণনায় বলেছেন, “সত্তর জন আত্মীয়ের ব্যাপারে তাদেয় শাফাআত গ্রহণ করা হবে।”–তিরমিযী, ইবনেমাজা।

পিতা-মাতার জনা নবালেগ মৃত সন্তানের শাফাআত ?

হযরত আবলাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কোন ব্যক্তি যদি তিনটি নাবালেগ সন্তানকে পূর্বেই পরকালে পাঠায়, অর্থাৎ নাবালক অবস্থায়ই তাদের মৃত্যু হয়। তাহলে সে তিন শিশু তাকে (নারী বা পুরুষ হােক) জাহান্নাম থেকে বাঁচাবার জন্য দুর্গের ন্যায় জাহান্নামের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। একথা শুনে হযরত আবু যার (রা) জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাে শুধুমাত্র দু’টি শিশুকে পাঠিয়েছি। (আমার সম্পর্কে কি বলেন?) তখন নবী করীম (সঃ) বললেন, দু শিশুর ব্যাপারেও এ একই কথা প্রযােজ্য। হযরত উবাই
ইবনে কা’ব (রা) জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাে একটি শিশুকে পাঠিয়েছি। (অর্থাৎ আমার একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আমার ব্যাপারে কি বলেন?) তখন নবী করীম (সঃ) বললেন, একটি শিশুর ব্যপারে ও এ একই কথা। অর্থাৎ সেপিতা-মাতার জন্য শাফাআতকারী হবে। –তিরমির্যী, ইবনে মাজা

কোরআনের হাফেজগণের শাফায়াত।

হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি সমস্ত কোরআন মজীদ মুখস্থ করেছে এবং তা পুরাে পুরিভাবে স্মরণে রেখেছে, আর কোরআন মজীদে যেসব কর্মকে হালাল বলেছে, তাকে সে স্বীয় আদ্দিা বিশ্বাস ও কর্মে হালাল রেখেছে, আর যেসব বস্তুকে হারাম বলেছে, তাকে সে বিশ্বাস ও কর্মে হারাম রেখেছে, তাকে আলাহ তাআলা জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। -তিরমিযী, ইবনে মাজা, 

কেউ কোরআন মজীদ মুখস্থ

করলে এবং তার বিধানসমূহ মেনে চললে আল্লাহ তাআলা তার পরিবারের দশজন জাহান্নামী লােকের জন্য তার সুপারিশ গ্রহণ করবেন। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে শুধু মুখস্থ করলেই হবে না, বরং কোরআনের দাবীসমূহ পূরণ করতে হবে এবং তার বিধি-বিধানসমূহ বাস্তব জীবনে পালন করতে হবে। কিন্তু তার দাবী ও বিধানসমূহ বাস্তবায়িত না করলে উল্টো কোরআন মজীদই তার বিরুদ্ধে সােচ্চার হবে এবং তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে। 

রােযা ও কোরআনের শাফাআ’ত ?

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মহাবিচারের দিন রােযা এবং কোরআন মজীদ (তার বাহকের জন্য) শাফাআত করবে। রােযা বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি এ ব্যক্তিকে দিনের বেলা পানাহার থেকে বিরত রেখেছিলাম (এবং অন্যান্য চাহিদার বস্তু হতেও বিরত করেছিলাম)। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর কোরআন মজীদ বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি এ ব্যক্তিকে রাতের বেলা নিদ্রা হতে বিরত রেখেছিলাম (কেননা রাতে সে আমাকে পাঠ করত এবং শােনত)। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। অতঃপর নবী করীম (সঃ) বললেন, অবশেষে উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে। —বায়হাকী, মেশকাত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *