মানুষের আমল মিযানের পাল্লায় পরিমাপ পদ্ধতি । আল্লাহর ক্ষমা ও মহাত্মা

শেষ বিচারের দিনে মানুষের আমল মিযানের পাল্লায় পরিমাপ পদ্ধতি । আল্লাহর ক্ষমা ও মহাত্মা
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মহাবিচারের দিন দাড়িপাল্লার জন্য একজন ফেরেশতাকে নিয়ােজিত করা হবে । মানুষকে এ পরিমাপ যন্ত্রের কাছে উপস্থিত করা হবে। যারাই আসবে তাদেরকেই উভয় পাল্লার মধ্যবর্তী স্থানে দণ্ডায়মান করা হবে। তার নেক পাল্লা যদি ভারী হয়, তাহলে ফেরেশতা উচ্চৈস্বরে ঘােষণা করবে, অমুক ব্যক্তি চিরদিনের জন্য সৌভাগ্যবান হয়েছে, সে কখনো হতভাগা হবে না। আর এ ঘোষণাঁ সমস্ত মাখলুকই শুনতে পারবে । আর যদি তার নেকের পাল্লা হালকা হয়, তাহলে ঐ ফেৱেশতা এমন উচ্চকণ্ঠে যা সমস্ত মাখলুক শুনতে পায় ঘােষণা করবে, অমুক ব্যক্তি চিরদিনের জন্য ব‍্যর্থ ও বিফল হয়েছে। সে আর কখনাে সৌভাগ্যবান হতে পারবে না । —বায়হাকী, বারযার

জনৈক বান্দার আমলের পরিমাপ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) বলেন, নবী করীম (সঃ) বলেছেন, মহাবিচারের দিন আল্লাহ তাআলা সমস্ত মাখলুকের সম্মুখে আমার এক উম্মতকে সমবেত গণজমায়েত হতে আলাদা করে তার সামনে নিরানব্বইটি দফতর খুলে ধরবেন। প্রত্যেকটি দফতর দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। এ দফতরগুলােতে তার সমস্ত গুনাহ লিপিবদ্ধ থাকবে। এরপর আল্লাহ তাআ’লা তার কাছে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এসব আমলনামার কোনটিকে অস্বীকার কর? আমার নিয়ােজিত লেখক ফেরেশতা কি তােমার প্রতি কোনরূপ অবিচার করেছে? সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি এসবের কোন কিছুই অস্বীকার করছি না এবং অবিচার করারও অভিযােগ তুলছি না। অতঃপর আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেন,
তােমার এসব খারাপ আমল সম্পর্কে কোন ওযর আপত্তি আছে কি? সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমার কোনই ওযর আপত্তি নেই।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, তবে তােমার একটি নেক আমল আমার কাছে সংরক্ষিত আছে।  আর তাকে বলা হবে, তুমি তােমার আমল ওজন হওয়া প্রত্যক্ষ কর। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমার আমল ওজন করা না করা উভয়ই সমান, আমার ধ্বংস হওয়া তাে অনিবার্য। কেননা বিরাটকায় নিরানব্বইটি দফতরের তুলনায় এ চিরকুটের অস্তিত্ব তাে মূল্যহীন। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি নিশ্চিন্ত মনে জেনে রেখ যে, তােমার প্রতি আজ বিন্দুমাত্রও জুলুম করা হবে না। (তােমার এ আমলনামা অবশ্যই ওজন করতে) সুতরাং নিরানব্বইটি দফতর মিযানের এক পাল্লায় আর চিরকুটখানা অন্য পাল্লায় রেখে ওজন করা হবে। ফলে ঐ দফতরগুলাের ওজন হবে হালকা এবং চিরকুটের ওজন হবে সে তুলনায় অনেক ভারী। এরপর নবী করীম (সঃ) বললেন, আসল কথা হচ্ছে আল্লাহ তাআলার নামের বর্তমানে তার তুলনায় কোন বস্তুই ওজনে ভারী হতে পারে না। –তিরমিযী, ইবনে মাজা, মেশকাত।

কাফেরদের পুণ্য হবে ওজনহীন

কাফের মুশরেকগণও মানবতার সেবায় অনেক ভাল ভাল কাজ ও জনকল্যাণমূলক কাজ করে থাকে। কিন্তু তাদের সে কাজ হবে নিষ্ফল । মহাবিচারের দিন তাদের সে পুণ্যময় কাজগুলাের কোন ওজন থাকবে না এবং তা মিযানে ওজনও করা হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন।
 “ হে নবী! আপনি বলুন, আমি কি তােমাদেরকে সে লােকদের সম্পর্কে অবহিত করব, যারা হবে আমাদের দিক দিয়ে অতিশয় ক্ষতিগ্রস্ত? তারা হচ্ছে সেসব লােক যাদের আমল দুনিয়ার জীবনেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। অথচ তারা মনে করে যে, তারা খুব পুণ্যময় কাজ করেছে। আর এসব লােকই তাদের প্রতিপালকের আয়াতকে এবং তার সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার বিষয়কে অস্বীকার করে থাকে। ফলে তাদের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং কেয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য ম্যিান কায়েম করব না। অর্থাৎ তাদের আমল মিযানে পরিমাপ করব না। ‘ —সূরা কাহাফ- শেষ রুকু।

ইহুদী, খ্রিস্টান ও কাফের মুশরেকগণ দুনিয়ার জীবনে নিজ নিজ খেয়াল খুশিমত অনেক ভাল ভাল কাজ করে। যেমন পানি পানের জন্য নলকূপের ব্যবস্থা করে, অভাবী লােকদেরকে নানাভাবে সাহায্য সহযােগিতা করে। অথবা আল্লাহ তাআলা নামসমূহ নিয়মিতভাবে স্মরণ করে। এ ধরনের কোন কাজ দ্বারাই তারা পরকালে নাজাত পাবে না। সাধু-সন্ন্যাসীগণ যে বিরাট বিরাট কাজ ও সাধনায় নিমগ্ন হয়ে নিজের দেহকে কষ্ট দেয় এবং প্রবৃত্তিকে বৈধ চাহিদা হতে বিমুখ রেখে নিজের প্রতি জুলুম করে। ইহুদী-খ্রিস্টানদের ধর্মীয় নেতা পাত্রীরা পুণ্যলাভের আশায় বিবাহ থেকে বিরত থাকে। এদের সর্বপ্রকার কাজ-কর্মই অর্থহীন ও পুণ্যহীন কাজ। পরকালে এসব কাজ দ্বারা কোন ফলােদয় হবে না। কুফরীর কারণে পরকালে এ কাজের কোন ফল তারা লাভ করতে পারবে না। কাফেরদের পুণ্যময় কাজগুলাে হবে প্রাণহীন। মহাবিচারের দিন তাদের হাত হবে পুণ্যশূন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“ যারা নিজদের প্রতিপালকের সাথে কুফরী করে, তাদের কর্মের উদাহরণ হল বালুরাশি, যাতে প্রচণ্ড ঘূর্ণি বায়ুর দিন তাকে নিমেষে দূর-দূরান্তে উড়িয়ে নেয়। (এমতাবস্থায় যে, বালুরাশির কোন চিহ্নই থাকে না) এমনিভাবে তারা যা কিছু কামাই করেছে, তার উপর তাদের কোন ক্ষমতাই থাকবে না। আর এটা হচ্ছে তাদের সুদূরপ্রসারী বিভ্রান্তি। ” —সূরা ইবরাহীম- ৩ য় রুকু।

হাকীমুল উম্মত স্বীয় তাফসীর বয়ানুল কোরআনে সূরা আরাফের শুরুতে এক ভূমিকার পর বলেছেন, মিযানে ঈমান ও কুফর উভয়কেই ওজন করা হবে। এ পরিমাপে এক পাল্লা খালি থাকবে, আর অপর পাল্লায় মুমিন হলে তার ঈমানকে এবং কাফের হলে তার কুফরীকে রাখা হবে। আর এ পরিমাপ দ্বারা মুমিন ও কাফের ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হবে। অতঃপর খাস মুমিন লােকের জন্য এক পাল্লায় তাদের পুণ্যসমূহ এবং অপর পাল্লায় তাদের গুনাহসমূহ রেখে ওজন করা হবে। যেমন তাফসীরে দুররে মানছুরে উল্লেখ আছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, মহাবিচারের দিন মিযানে মুমিন ব্যক্তির পুণ্যের পাল্লা ভারি হলে তারা জান্নাত লাভ করবে। আর গুনাহের পাল্লা ভারি হলে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর উভয় পাল্লা সমান হলে তারা আরাফে অবস্থান করবে। অতঃপর হয় শাস্তির পূর্বে শাফাআতের বদৌলতে অথবা শাস্তি ভােগের পর ক্ষমা লাভের ফলে জাহান্নামী মুমিন বান্দারা এবং আরাফে অবস্থানকারী বান্দারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।

আল্লাহর করুণায় ক্ষমা লাভ

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাআ’লা দয়া ও করুণা ছাড়া কোন ব্যক্তি কক্ষনাে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে । একথা শুনে উপস্থিত সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও কি আল্লাহ তাআলার দয়া ও করুণা ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন না? জবাবে নবী করীম (সঃ) স্বীয় হাত মাথায় রেখে বললেন, না, আমিও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব না। তবে আল্লাহ তাআলা তাঁর করুণা ও রহমত দ্বারা আমাকে আচ্ছাদিত করে রাখবেন। —আহমদ, আক্তারগীব অত্যারহীব।

এ হাদীসে প্রত্যেক পুণ্যবান ব্যক্তিকে বিশেষ করে যেসব আবেদ দরবেশ জাকের ও মুজাহিদ ব্যক্তিগণ সর্বদা পুণ্যময় কাজে মশগুল থাকেন, তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে। তাদেরকে এ মর্মে সতর্ক করা হয়েছে যে, তারা যেন নিজদের পুণ্যময় কর্মের জন্য উল্লসিত না হয়, তারা যেন একথা না ভাবে যে, অবশ্য অবশ্যই আমরা জান্নাতের হকদার । বরং নিজের আমলকে তুচ্ছ মনে করবে এবং মনে মনে এ ভয় পােষণ করবে যে, হয়তাে আমার আমল কবুল না-ও হতে পারে।

মহাবিচারের দিন প্রত্যেকেই অনুতপ্ত হবে

হযরত মুহাম্মদ ইবনে আবী উমাইয়াহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কেউ যদি জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার বন্দেগীতে সেজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে, তবু সে তার এত বিপুল পরিমাণ আমলকে কেয়ামতের দিন অতি তুচ্ছ মনে করবে। আর সে তখন এ আশা পােষণ করতে থাকবে যে, হায়! আমাকে যদি দুনিয়ায় ফেরত পাঠান হত, তাহলে আমি বেশি বেশি আমল করে বিপুল পরিমাণে পুণ্যলাভ করতে পারতাম।
—আহমদ, আত্তারগীব অতৃতারহীব।

হযরত আবু হােরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তােমাদের মধ্যে যারই মৃত্যু ঘটে, সে-ই নিজে নিজে লজ্জিত হয়। সাহাবী (রাঃ) গণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কি কারণে সে লজ্জিত হয়? নবী করীম (সঃ) বললেন, সে ব্যক্তি যদি ভাল কাজ করে থাকে, তাহলে এই ভেবে লজ্জিত হবে যে, আমি কেন আরও ভাল কাজ করলাম না! আর যদি সে খারাপ কাজ করে থাকে তখন সে এ অনুশােচনা করে লজ্জিত হবে যে, হায়! আমি কেন খারাপ কাজ থেকে নিজকে রক্ষা করলাম না! –তিরমিযী, মেশকাত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *