সূরা ইউসুফ এর শিক্ষা Sura Yusuf Education Story Bangla

 ইয়াকুব আলাইহিস সালাম আশঙ্কা করেছিলেন যে, তাঁর অন্য সন্তানেরা যদি ইউসুফ আলাইহিস সালামের স্বপ্নের ব্যাপারে জেনে যায়, তাহলে তারা যেকোনো প্রকারেই ইউসুফ আলাইহিস সালামের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে।

ইউসুফ আলাইহিস সালামের ক্ষতি তাঁর ভাইয়েরা ঠিক-ই করেছিলো, তবে তা সেই স্বপ্নের কারণে নয় যা ইউসুফ আলাইহিস সালাম দেখেছিলেন। এই স্বপ্নের কথা ঘুণাক্ষরেও তাঁর ভাইয়েরা জানতে পারেনি। তারা ইউসুফ আলাইহিস সালামের ক্ষতি করেছিলো এই কারণে যে— ইউসুফ আলাইহিস সালামকে ইয়াকুব আলাইহিস সালাম অন্য সন্তানদের চাইতে বেশি ভালোবাসতেন।

কুরআন ব্যাপারটাকে এভাবে বর্ণনা করেছে:
‘স্মরণ করুন, যখন তারা বলাবলি করছিলো, ‘নিশ্চয় ইউসুফ এবং তার ভাই আমাদের পিতার কাছে আমাদের চাইতে অধিক প্রিয়। অথচ দেখো, আমরা পুরো একটা দল’।- সুরা ইউসুফ ০৮

ইউসুফ আলাইহিস সালামের ওই দূর্ভোগের নেপথ্য কারণ তাঁর স্বপ্ন ছিলো না, ছিলো তাঁর প্রতি পিতার অগাধ ভালোবাসা, দরদ এবং অতি-মমতা। ইউসুফের প্রতি পিতার এমন মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা, স্নেহ, যত্ম, আদর আর মমতাকে অন্য ভাইয়েরা হিংসার চোখে দেখতে শুরু করলো।

তারা ধরে নিলো— পিতার এই ভালোবাসা যদি ইউসুফের প্রতি অব্যাহত থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ইউসুফ তাদের জন্য অনেককিছুতে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তারা তাদের পথের কাঁটা মনে করলো এবং এই কাঁটা সরাবার একটাই উপায়— তাঁকে হত্যা করা কিংবা দূরে এমন কোথাও রেখে আসা যেখান থেকে সে আর কোনোদিন পিতা ইয়াকুব আলাইহিস সালামের নাগাল পাবে না। ইউসুফ আলাইহিস সালামকে সরিয়ে দেওয়া গেলে পিতার সমস্ত মনোযোগ তাদের ওপর এসে পড়বে এবং তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে। কুরআন সেটাকেও বর্ণনা করেছে এভাবে:

‘তোমরা ইউসুফকে হত্যা করে ফেলো কিংবা তাকে ফেলে আসো কোন সুদূর ভূমিতে। তাহলেই তোমাদের পিতার দৃষ্টি তোমাদের ওপর নিবদ্ধ হবে’- সুরা ইউসুফ ০৯

ইউসুফ আলাইহিস সালামের স্বপ্নের ব্যাপারে বিন্দু বিসর্গও জানতো না তাঁর ভাইয়েরা। ইয়াকুব আলাইহিস সালাম যে কারণে ভয় পেয়েছিলেন তা ঘটেনি ঠিক, কিন্তু ইউসুফ আলাইহিস সালাম ভাইদের ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারেন নি শেষপর্যন্ত। ক্ষতির কারণ— তাঁকে তাঁর পিতা অন্য সবার চাইতে বেশি ভালোবাসতেন।

আচ্ছা, সুরা ইউসুফের এই জায়গায় এসে, জীবনের কোন পাঠ আমরা রপ্ত করতে পারি? কোন গভীর আত্ম-জিজ্ঞাসায় নিজেকে ঝালিয়ে নিতে পারি আরেকবার?

সুরা ইউসুফের এই অংশটা আমাদের শেখাচ্ছে— আমাদের সব সমালোচকেরাই আসলে প্রকৃত সমালোচক নয়। আমরা ভুল করছি বা করেছি বলেই তারা সর্বদা আমাদের সমালোচনা করেন না। তারা মাঝে মাঝে আমাদের সমালোচনা করেন হিংসা থেকে। মাঝে মাঝে আমাদের যোগ্যতা তাদের মনে হিংসার আগুনকে উস্কে দেয়। আমাদের গ্রহণযোগ্যতা তাদেরকে জ্বলে-পুড়ে খাক করে। মানুষ যখন আমাদের প্রশংসা করে, আমাদের ভালোবাসে, আমাদের অনুসরণ করে, মনোযোগ দিয়ে আমাদের দেখে, তন্ময় হয়ে আমাদের কথা শুনে— তখন এই সমালোচকবৃন্দ নিজেদের হাত নিজেরা কামড়াতে থাকে।

কেনো মানুষ তাদের রেখে আপনাকে বেশি ভালোবাসছে, কেনো মানুষ তাদের বাদ দিয়ে আপনার কথা বেশি শুনছে, কেনো তাদের অনুসারীর চাইতে আপনার অনুসারীর সংখ্যা বেশি, কেনো তাদের কথার চাইতে আপনার কথার গ্রহণযোগ্যতা বেশি— এই সমস্ত কিছু তাদের মনে আগুন ধরায়।

ফলে, তারা যখন সত্য কথাটা মুখে বলতে পারে না, তখন তারা আপনার সমালোচনায় লেগে পড়ে। আপনার সামান্য বিচ্যুতিকে নিয়েও তারা মজা-মস্কারায় মেতে উঠে, নিন্দা-সভার আসর বসায়।

এদের সাথে আমি ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের খুব মিল পাই। ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা পিতার কাছে ইউসুফ আলাইহিস সালামের গ্রহণযোগ্যতা মেনে নিতে পারেনি। তারা হিংসায় জ্বলে-পুড়ে যেতো। ইউসুফ আলাইহিস সালামকে সইতে না পেরে, সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করবার কৌশলও এঁটেছিলো তারা এবং তা বাস্তবায়নে এগিয়েও গিয়েছিলো।

অধুনা যুগে আপনার নিন্দুকেরা আপনাকে হত্যা করতে চায় না, আপনাকে কূপেও ফেলতে চায় না, তবে বাক্য-বাণে তারা ঝাঝরা করে দিতে চায় আপনার বুক। তারা আপনাকে কথার মারপ্যাঁচে বিধ্বস্ত করে দিতে চায়। তারা আপনার অনুসারীদের বিভ্রান্ত করতে চায় যাতে তারা আপনার কথা না শুনে, আপনার লেখা না পড়ে। তারা অবিরত আপনার নিন্দা করে বেড়ায় আপনাকে আপনার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে। যাতে আপনি হতাশ হয়ে পড়েন, পিছিয়ে পড়েন।

জেনে রাখুন— চারপাশে যারা আপনার নিন্দা করে বেড়ায় তারা সর্বদা এইজন্যেই তা করে না যে, আপনার যোগ্যতা তাদের চাইতে কম। বরং, মাঝে মাঝে তারা আপনার নিন্দা করে, কারণ— আপনার যোগ্যতা তাদের চাইতে অনেক অনেক বেশি।

ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা ইউসুফ আলাইহিস সালামকে অযোগ্যতার কারণে অপছন্দ করতো না। তারা তাঁকে অপছন্দ করতো তাঁর অতি-যোগ্যতার কারণে।

সুতরাং, আপনাকে ঘিরে মানুষের সকল অপছন্দ, সকল নিন্দাকে আমলে নিবেন না। আপনার পেছনে তাদের যাবতীয় কটু-কথা, বাক্য-বাণ এবং তীর্যক মন্তব্যে হতাশ হওয়ারও দরকার নেই। তাদের অনেক অপছন্দ, অনেক নিন্দা তাদের হিংসা-পূর্ণ অন্তর থেকে উদগীরিত। তাদের ব্যাপারে ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের পরিণতির কথা ভেবে শুকরিয়া করুন। হতে পারে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা কোনএকদিন তাদেরকে আপনার কাছে এনে ফেলবে যেভাবে ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদেরকে তিনি ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাছে এনে ফেলেছিলেন। হয়তো একদিন আপনার নিন্দুকেরা আপনার কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইবে। আপনার জবাব নয়, নিন্দুকের জন্য আল্লাহর জবাবের অপেক্ষা করুন।


‘সুরা ইউসুফ থেকে আমি যা শিখেছি’

Leave a Comment