হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর ও বান্দার হক । পিতা মাতার উপর সন্তানের দাবি । Keyamot Hasor Moidan

হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর ও বান্দার হক ।  পিতা মাতার উপর সন্তানের দাবি ।  কেয়ামতের ময়দানে হাশরের দিন

মহান আল্লাহর ওপর বান্দার হক

হাশর ময়দানে আল্লাহ তাআলার হক যেমন- নামায, রােযা, হজ্ব ও যাকাত ইত্যাদি বিষয়ে হিসাব গ্রহণ করা হবে। অনুরূপভাবে বান্দার হক সম্পর্কেও হিসাব নেয়া হবে। দুনিয়া কেউ কারাে হক নষ্ট করলে বা আত্মসাত করলে অথবা কারােপ্র তি জুলুম-অত্যাচার করলে, তারও হিসাব ও বিচার হবে। বুজুর্গানেদ্বীন বলেছেন, মহাবিচারের দিন আল্লাহ তাআ’লার হক সম্পর্কে অপরাধী হয়ে তার সম্মুখে উপস্থিত হওয়া ততটা বিপদজনক নয়, যতটা বান্দার হক আত্মসাত করা এবং তার প্রতি জুলুম-অত্যাচার করা বিপদজনক। কেননা, আল্লাহ তাআলা হচ্ছেন মহান ও অভাবমুক্ত সত্তা। তাঁর পক্ষ থেকে তাঁর হকের ব্যাপারে ক্ষমা লাভ করার আশা করা যায়। কিন্তু বান্দা হচ্ছে অভাবী ও প্রয়ােজনশীল প্রাণী। তাদের এক একটি পুণ্য দ্বারা উপকৃত হওয়া ও মুক্তি লাভের আশা থাকবে। এ কারণে মহাবিচারের দিন বান্দার কাছ থেকে ক্ষমা লাভ এবং তার দাবী ছেড়ে দেয়ার আশা করা নিরর্থক। মহা বিচারের দিন টাকা-পয়সা, দিনার, ডলার, ধন সম্পদ কিছুই কাছে আসবে না। সেদিন দাবী পরিশােধ করা হবে পুণ্যের আদান-প্রদান করে। আর দাবী আদায়ের ব্যবস্থা এত সুন্দর ও নিরঙ্কুশ হবে যে, পশুরাও যে, একে অন্যের প্রতি জোর-জুলুম করে, সেদিন তারও প্রতিশােধ নেয়া হবে।

পাপ পুণ্য দ্বারা লেন-দেন হওয়া

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কেউ যদি তার ভাইয়ের প্রতি জুলুম করে, তাকে অপমান করে বা তার হক নষ্ট কিম্বা নিজে আত্মসাত করে, তাহলে আজই তার কাছে ক্ষমা চেয়ে সে দিনটি এসে পরার পূর্বেই তার দায়মুক্ত হওয়া উচিত, যেদিন দিনার-দিরহাম টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদ কিছুই থাকবে না। সেদিন কিছু পুণ্য থাকলে জুলুম পরিমাণ পুণ্য তার থেকে নিয়ে মজলুম বা পাওনাদার ব্যক্তিকে দান করা হবে। তার যদি কোন পুণ্য না থাকে, তাহলে মজলুম ব্যক্তির পাপ থেকে নিয়ে জালেম ব্যক্তির মাথায় চাপান হবে। —বােখারী, মেশকাত।

কেয়ামতের দিন সর্বাধিক নিঃস্ব ব্যক্তি 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সমস্ত মানুষকে হাশর ময়দানে জমায়েত করবেন, যারা হবে উলংগ, খাত্তাহীন ও রিক্ত হস্ত। অতঃপর এমন জোরে ডাক দেয়া হবে, যে ডাক নিকটবর্তীরা যেমন শুনবে তেমনি দুরবর্তীরাও শুনবে। বলা হবে, আমি প্রতিদান দানকারী, আমি রাজাধিরাজ। কোন জান্নাতী ব্যক্তির কাছে কোন হক বা পাওনা থাকা অবস্থায় কোন জাহান্নামী জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার পাওনা আদায় করে না দেব। এমনকি যদি একটি ঘুষিও কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে মেরে থাকে, তবে আমি তারও প্রতিশােধ আদায় করে দেব ।বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! প্রতিশােধ কিভাবে দেয়া হবে? আমরা তাে তখন উলংগ, খাতনাহীন ও খালি হাতে হব? নবী করীম (সঃ) বললেন সেদিন পাপ ও পুণ্য দ্বারা লেন-দেন, দাবী আদায় ও প্রতিশােধ গ্রহণ করা হবে -(আহমদ, আত্তারগীব অততারহীব) । হযরত আবু হােরায়রা (রা) বলেন, কেউ যদি তার গােলামকে একটি বেত্রাঘাতও করে, তাহলে মহাবিচারের দিন সে গােলামকে প্রতিশােধ আদায় করে দেয়া হবে। —(তাবারানী, বাযযার, আত্তারগীব অত্তারহীব)

পিতা-মাতাও তাদের দাবী ছাড়তে সম্মত হবে না হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, সন্তানের কাছে পিতা-মাতার যদি কোন ঋণ বা পাওনা থেকে থাকে, তাহলে কেয়ামতের দিন তারাও সন্তানের প্রতি বিরক্ত হয়ে বলবে, তুমি আমার ঋণ পরিশােধ কর। সন্তান তখন বলবে, আমি তাে তােমারই সন্তান। একথায় পিতা-মাতার মনে কোন প্রভাব পড়বে না। তারা তাদের দাবী পূরণের জন্য তাকে বারবার তাকিদ দিতে থাকবে। এমনকি তারা তখন এ আশা পােষণও করতে থাকবে যে, হায়! তার কাছে যদি আমাদের আরও ঋণ পাওনা থাকত (তাবারানী, আতারগীব অতারহীব)। হযরত উকবা ইবনে আমের (রা) বলেন, নবী করীম (সঃ) বলেছেন, “ মহাবিচারের দিন সর্বাগ্রে বাদী ও বিবাদী হবে দু’জন প্রতিবেশী।” –আহমদ, মেশকাত।

জীব-জন্তুর বিচার ফয়সালা

হাশর ময়দানে সবারই হিসাব গ্রহণ করা হবে এবং প্রত্যেক মজলুম ব্যক্তির ব্যাপারে ইনসাফ ও সুবিচার করা হবে। হযরত আবু হােরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, মহাবিচারের দিন তােমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই দাবীদারদের দাবী পরিশােধ করতে হবে। এমনকি শিংহীন বকরী (যাকে শিং বিশিষ্ট বকরী আঘাত করেছিল) শিং বিশিষ্ট বকরী থেকে প্রতিশােধ আদায় করে দেয়া হবে। —মুসলিম, মেশকাত।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “সেদিনটির আগমন অবশ্যাম্ভাবী, সুতরাং যার ইচ্ছে হয়, সে যেন আপন প্রতিপালকের কাছে স্বীয় স্থান করে নেয়। আমি তােমাদেরকে এক নিকটবর্তী শাস্তি সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করছি। সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি আপন কৃতকর্ম দেখতে পাবে। সেদিন কাফের লােক বলবে, হায়! আমি যদি মাটিতে পরিণত হতে পারতাম। —সূরা আন্নাবা।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে দুররে মানছুরে বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত আবু হােরায়রা (রা) -এর উদ্ধৃতি বর্ণনা করেন, হাশর ময়দানে সমস্ত প্রাণীকে একত্রিত করা হবে। চতুষ্পদ প্রাণী, ভূমিতে চলমান প্রাণী ও পাখীকুলসহ সব কিছুকে উপস্থিত করা হবে। তখন আল্লাহ তাআলার বিচারাল থেকে যে রায় ঘােষণা হবে, তাতে এ ফয়সালাও থাকবে যে, শিংহীন পশুকে শিং বিশিষ্ট পশু থেকে প্রতিশােধ আদায় করে দেয়া হবে। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, তােমরা মাটি হয়ে যাও। এ সময় কাফেরের মুখ থেকে আফসােস ও অনুশােচনামূলক যে কথা বের হবে তা হল, হায়! আমি যদি অস্তিত্বহীন হয়ে মাটিতে পরিণত হতে পারতাম। -তাফসীরে দূররে মানছুর

আল্লাহ তাআলা বলেন: “ যারা কুফরী এবং রাসূলের নাফরমানি করেছে, তারা আজ আশা করবে যে, হায়! আমি যদি মাটির সাথে মিশে যেতে পারতাম।” — সূরা নিসা ।

বিশিষ্ট মুফাসসির মুজাহিদ (র) বলেন, যে জীবকে ঠোকর মারা হয়েছে, তাকে ঠোকরদানকারী জীব হতে এবং যে প্রাণীকে লাথি মারা হয়েছে, সে প্রাণীকে লাথিদাতা প্রাণী হতে প্রতিশােধ গ্রহণ করে দেয়া হবে। হাশর ময়দানে এসব ঘটনা মানুষের সামনেই সংঘটিত হবে এবং তারা তা অবলােকন করবে। অবশেষে জীব-জন্তুকে বলা হবে, তােমরা মাটিতে পরিণত হও। তােমাদের জন্য যেমন জান্নাত নেই, তেমনি জাহান্নামও নেই। এ সময় কাফেরগণ জীব-জন্তুর মুক্তি এবং চিরস্থায়ী শাস্তি হতে নাজাতের সাফল্য দেখে আশা পােষণ করে বলবে, হায়! আমরাও যদি মাটিতে পরিণত হতে পারতাম (তাফসীরে দুররে মানছুর) । পক্ষান্তরে যারা দুনিয়াকে পরকালের আমলের ক্ষেত্র রূপে মনে করে পরকালের জন্য চিন্তা-ভাবনা করেছে। সেখানকার সুখ-শান্তির জন্য আমল করেছে। সেখানে তারা অবশ্যই সুখ ও শান্তিময় পরিবেশে অবস্থান করবে। 

মনিব ও ভৃত্যদের মাঝে ন্যায় বিচার

আল্লাহ তাআলা বলেন,
 “ আমি কেয়ামতের দিন ইনসাফ ও সুবিচারের দাড়িপাল্লা প্রতিষ্ঠিত করব। সুতরাং কারাে প্রতি বিন্দু পরিমাণও জুলুম করা হবে না। কেউ যদি সরিষার দানা পরিমাণও কোন কাজ করে থাকে, তবে আমি তা-ও উপস্থিত করব। আর হিসাব গ্রহণে আমিই যথেষ্ট।” —সূরা আম্বিয়া- ৪ র্থ রুকু।

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর কাছে এসে আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কয়েকজন ভৃত্য আছে যারা আমার
সাথে মিথ্যা কথা বলে এবং বিশ্বাসঘাতকতা করে। আর আমার কথাও তারা অমান্য করে। (এ হচ্ছে তাদের দিকের অপরাধ, আর আমার অপরাধ হল) আমি তাদেরকে গালি-গালাজ করি এবং মারপিট করে শাস্তি দেই। এখন আপনি বলুন, পরকালে তাদের ও আমার অবস্থা কেমন হবে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, কেয়ামতের দিন, তােমার গােলামগণের বিশ্বাসঘাতকতা, অবাধ্যতা এবং মিথ্যা বলা এবং তুমি তাদের শাস্তি দেয়া সম্পর্কে হিসাব-নিকাশ নেয়া হবে। তােমার শাস্তি যদি তাদের অপরাধের সমপরিমাণ হয়, তাহলে ব্যাপারটি সমান সমানই থাকবে, তাদের কাছ তুমি কিছু পাবে না আর তারাও তােমার উপর কোন বােঝা চাপাতে পারবে না। আর যদি তাদের অপরাধের তুলনায় তােমার দেয়া শাস্তি কম হয়, তাহলে তাদের অতিরিক্ত অপরাধ তােমার কাজে আসবে। তুমি তাদের কাছ থেকে প্রতিশােধ গ্রহণ করবে। আর যদি তােমার শাস্তি তাদের অপরাধের তুলনায় বেশি হয়ে যায়, তাহলে যতটুকু শাস্তি বেশি হয়েছে, ততটুকু প্রতিশােধ তােমার থেকে নিয়ে তাদেরকে দেয়া হবে। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, নবী করীম (সঃ) -এর মুখে একথা শুনে লােকটি কাঁদতে কাঁদতে ও চিৎকার করতে করতে সেখানে থেকে উঠে গেল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *