হাশরের ময়দানে মানুষের সন্মান ও হাশরের মাঠে ধনী গরিব কাফের মুশরেকদের অবস্থা ! Hasorer Moidan

হাশরের ময়দানে মানুষের সন্মান ও হাশরের মাঠে ধনী গরিব কাপের মুশরেকদের অবস্থা ! Hasorer Moidan
কেয়ামতের দিন মানুষদের পিতার নামসহ  মানুষের নাম ধরে ডাকা হবে (অর্থাৎ হে খালেদের পুত্র আবদুল্লাহ বলে ডাকা হবে) । কেয়ামত মানুষকে সম্মানিত ও অপমানিত করবে। হাশরের ময়দানে দুনিয়ার অনেক অবহেলীত লােক হবে সম্মানীত। আর অনেক গর্বিত ও অহংকারী ধনশালী লােক হবে অপমানিত। কেয়ামত হচ্ছে সম্মানিত ও অপমানিত হওয়ার দিন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
“ যখন মহা প্রলয় সংঘটিত হবে। সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও মিথ্যার লেশ নেই। সে মহাপ্রলয় (কেয়ামত) কতককে করবে হীন  অপমানিত, আর কতককে করবে সম্মানিত ও উন্নত। ” –সূরা ওয়াকিয়া ।
দুনিয়াতে অনেক লােক বিনয় ও নম্র অবস্থায় জীবন যাপন করে থাকে, তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা হত। তাদেরকে নীচ জাত ও নীচ বংশের ভাবা হত। তারা নিজেদের সম্মান ও গৌরবের প্রতি আদৌ লক্ষ্য করত না। তারা যেহেতু আল্লাহ তাআলার সাথে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করত, এ কারণে কেয়ামতের দিন তাদের কেউ মেশকের টিলায়; কেউ নূরের মিম্বরে, আবার কেউ আরশের ছায়াতলে মহা সম্মানের সাথে অবস্থান করবেন। অতঃপর তাদের মধ্যে অনেকে বিনা হিসাবে, অনেকে হিসাবান্তে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা জান্নাতের বালাখানায় চির আনন্দময় পরিবেশে থাকবেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
 “ এসব লােক ঈমান ও ধৈর্য সঞ্চিতার কারণে এমন বালাখানায় অবস্থান করবে, যাতে তারা লাভ করবে অভিবাদন ও শান্তি। ” সূরা ফুরকান ।

নবী করীম (সঃ) বলেছেন, দুনিয়াতে যারা অপরিমিত পানাহার ও বিপুল ধন সম্পদের মধ্যে বিলাসবহুল জীবন যাপন করত, তারা অনেকেই পরকালে উলংগ ও বুভুক্ষ অবস্থায় থাকবে। সাবধান! দুনিয়ায় অনেকে নিজদেরকে সম্মানিত বানিয়ে নিয়েছে। আসলে তারা নিজেদেরকে হীন ও অপমানিত করছে। (পরকালে তাদের কোনই পাত্তা থাকবে না।) আর দুনিয়ায় এমনও অনেক মানুষ আছে, যারা নিজদেরকে বিনয় ও নম্রতার কারণে হীন ও তুচ্ছ করে রেখেছে। মূলত তারা নিজদেরকে সম্মানিত করে তুলছে। কেননা তাদের বিনয় ও নম্রতা তাদেরকে জান্নাতে পৌছে দেবে। —আতারগীব অতারহীব।

হযরত আবু হােরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, হাশরের দিন অনেক মােটা তাজা ও ভারী লােক আল্লাহ তাআ’লার কাছে মশা-মাছির
সমতুল্যও ওজন হবে না (সেদিন তাদের কোন মর্যাদাই থাকবে না)। অতঃপর রাসূল (স) বললেন, তােমরা কোরআন মজীদের এ আয়াতটি পাঠ কর।
 কেয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য কোন পরিমাপ যন্ত্রই কায়েম করব —বােখারী, মুসলিম, মেশকাত ।

হাশর ময়দানে মুশরেকরা দুনিয়ায় শিরক ও কুফরী করার কথা অস্বীকার করবে। কোরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন:

“ সে দিনটি স্মরণযােগ্য, যে দিন আমি সকলকে একত্রিত করব। অতঃপর আমি মুশরেকদেরকে বলব, তােমরা যাদেরকে মাবুদ ধারণা করে আমার সাথে শরীক করতে, তারা আজ কোথায়? অতঃপর তাদের ফেত্নার বিষয় এরূপ হবে যে, তারা বলবে, আমরা আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, তিনিই আমাদের প্রতিপালক, দুনিয়ায় আমরা মুশরেক ছিলাম না। সূরা আনয়াম -৩ রুকু।
“ লক্ষ করুন তারা আপন সত্তার প্রতি কিভাবে মিথ্যারােপ করছে। যাকে তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করছিল এখন তা সবই অদৃশ্য হয়ে গেছে। ” 

মহাবিচারের দিন কাফের মুশরেকগণ শিরক ও কুফরীর কথা অস্বীকার করলেও তারা নাজাত পাবে না। তাদের আমলনামা ও সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা তাদের শিরক-কুফরীর অপরাধ প্রমাণ হবে। প্রমাণ হওয়ার পরই তারা অপরাধ স্বীকার করবে। যেমন সূরা আনয়ামের ১৬ তম রুকুতে উল্লেখ হয়েছে যে, স্বীকার করার পরও তারা চিরন্তন শাস্তি হতে নাজাত পাবে না।
এরপর আল্লাহ বলেন, যাদের পুজা করত তারাও অস্বীকার করবে কাফের মুশরেকগণ আল্লাহ তাআলার সত্তা, গুণাবলী ও ক্ষমতায় যাদেরকে অংশী সাব্যস্ত করত, তারাও মহা বিচারের দিন তাদের এবাদাত করার কথা অস্বীকার করবে। এ বিষয়ে কোরআন মজীদের আল্লাহ তাআলা বলেন,

“ তাদের অংশীদারগণ বলবে, তােমারা আমাদের এবাদাত বন্দেগী করতে না। এ ব্যাপারে আমাদের ও তােমাদের মধ্যে সাক্ষী হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআ’লাই যথেষ্ট। তােমরা যে, আমাদের এবাদাত করতে সে ব্যাপারে আমরা ছিলাম। সম্পূর্ণ অমনােযােগী। ” —সূরা ইউনুস- ৩ য় রুকু।

হিসাব-নিকাশ, বিচার, আমল ও ওজনের বিবরণ

কেয়ামতের দিন সর্বাগ্রে যেসব লােকের বিচার ফয়সালা করা হবে, তাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি থাকবেন যাকে জিহাদে নিহত হওয়ার কারণে শহীদ মনে করা হয়। তাকে কেয়ামতের দিন উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তাকে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত সমূহের কথা স্মরণ করান হবে। ফলে তারও সেসব নেয়ামতের কথা মনে পড়বে। আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি আমার এসব নেয়ামতসমূহ কি কি কাজে ব্যবহার করেছ? প্রত্যুত্তৰুে সে বলবে, আমি আপনার পথে লড়াই করতে করতে অবশেষে শহীদ হয়েছি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ, তােমার এ কথা সত্য নয়। তুমি আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করনি, দুনিয়ায় মানুষ যাতে তোমাকে বীর বলে সেজন্য যুদ্ধ করেছ । অতঃপর তাকে অধঃমুখী করে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার হুকুম দেয়া হবে এবং সে হুকুম সাথে সাথে বাস্তবায়িত হবে।

আল্লাহ তাআলা পার্থিব জীবনে যাকে অনেক কিছু দান করেছিলেন। কেয়ামতের দিন তাকে হাশর ময়দানে আল্লাহ তাআ’লার বিচারালয়ে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ তাকে স্মরণ করা হলে সবই তার মনে পড়বে। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এসব নেয়ামত কি কি কাজে ব্যয় করেছ? সে লােক বলবে, যেসব কল্যাণকর খাতে ব্যয় করনে আপনি সন্তুষ্টি হন, সেসব খাতের কোনটিই আমি ছাড়িনি, বরং সব খাতেই ব্যয় করেছি। আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমার ধন সম্পদ আপনার পথে ব্যয় করেছি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ । (আমার সন্তোষ লাভের জন্য তুমি ব্যয় করনি) বরং তােমাকে যাতে মানুষ দানবীর বলে সে জন্য তুমি ব্যয় করেছ। দুনিয়ায় তােমার মনের উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। (এখানে তােমার কোন প্রতিদান নেই।) অতঃপর তাকে অধঃমুখী করে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার হুকুম হবে। আর সে হুকুম যথাযথভাবেই তামিল হবে। —মুসলিম।

এ হাদীসটি সুনানে তিরমিযী গ্রন্থেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে অতিরিক্ত একথা সংযােজিত হয়েছে যে, হযরত আবু হােরায়রা (রা) যখন এ হাদীসটি

বর্ণনা করার ইচ্ছা করলেন, তখন হাশর ময়দানের দৃশ্য তার সম্মুখে ভেসে উঠল। সে দৃশ্য অবলােকনে তিনি বেঁহুশ হয়ে পড়লেন। অতঃপর তার চেতনা ফিরে আসলে তিনি পুনরায় হাদীস বর্ণনা শুরু করলে আবার চেতনা হারিয়ে ফেললেন। আবার চেতনা ফিরে পেলে তিনি পুনরায় হাদীস বর্ণনা শুরু করলেন। সেবারেও তিনি চেতনা হারালেন। তারপর চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি এ হাদীস বর্ণনা এ হাদীসটি হযরত মুয়াবীয়া (রা) -কে শুনান হলে তিনি বললেন, এ তিন ব্যক্তির সাথে যখন এমনি ব্যবহার করা হবে, তখন অন্যান্য খারাপ নিয়তের মানুষের ব্যাপারে ভাল ব্যবহার করার কোন আশাই করা যায় না। এরপর মুয়াবীয়া (রা) এতটা কাঁদলেন যে, দর্শকমণ্ডলী মনে করল যে, আজই তাঁর প্রাণ চলে যাবে। –তিরমিযী।
আল্লাহ তাআলা যেদিন মানুষের আমলের প্রতিদান দেবেন, সেদিন নেককারদেরকে বলবেন, “তােমরা দুনিয়ায় যাদেরকে দেখাবার জন্য আমল করতে তাদের কাছে যাও, গিয়ে দেখ তাদের কাছে তােমাদের সে আমলের কোন প্রতিদান বা কল্যাণ পাওয়া যায় কি না। মেশকাত। 

Leave a Comment